অতিরিক্ত পানি পানও হতে পারে বিপজ্জনক

অতিরিক্ত পানি পানও হতে পারে বিপজ্জনক

চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা প্রতিদিন প্রচুর পরিমাণে পানি পান করার কথা বলে এসেছেন বারবার। কিন্তু সাম্প্রতিক এক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে অতিমাত্রায় পানি পানের বিপজ্জনক পরিণতি সম্পর্কেও সাবধান করেছেন তারা। অতিমাত্রায় পানি পান করে এক নারী অসুস্থ হয়ে পড়ার কারণে তারা এ সাবধানবাণী দিয়েছেন। খবর ইনডিপেনডেন্ট।

সম্প্রতি ৫৯ বছর বয়সী এক নারীকে প্রতি ৩০ মিনিটে আধা পাইন্টের (প্রায় ১ গ্লাস) বেশি পানি পান করার পরামর্শ দেন তার চিকিৎসক। এ পরামর্শ মানতে গিয়ে দ্রুত অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। পরবর্তীতে রক্তে লবণের মাত্রা ভয়াবহ মাত্রায় কমে এলে লন্ডনের কিংস কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হতে হয় তাকে। দ্রুত চিকিৎসা না দেয়া হলে তার মৃত্যুর আশঙ্কাও ছিল অনেক বেশি।

বর্তমানে চিকিৎসকদের ভাবনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, পানি পানের নিরাপদ মাত্রা আসলে কতটুকু। বর্তমানে এ নিয়ে গভীর পরীক্ষা-নিরীক্ষার আয়োজন করছেন তারা।

সম্প্রতি ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নাল কেস রিপোর্টে ডা. লরা ক্রিস্টিন লি ও ডা. মেরিয়েন নোরোনহা প্রশ্ন তোলেন, ‘আমরা অসুস্থ রোগীদের প্রতিনিয়তই প্রচুর পানি পান ও শরীরে এর মাত্রা বজায় রাখার উপদেশ দিচ্ছি। কিন্তু এ দিয়ে আমরা আসলে কী করছি? আপাতদৃষ্টিতে ঝুঁকিহীন মনে হলেও, এতে কি ক্ষতির সম্ভাবনা নেই?’

উল্লিখিত রোগী এ দুজন চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণের আওতায় ছিলেন। রোগীর ঘটনাটিকে কেস হিসেবে উত্থাপন করে জার্নালে এ দুই চিকিৎসক বলেন,  ‘হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যখন তাকে আনা হয়, তখন তাকে বেশ বিধ্বস্ত ও অসুস্থ দেখাচ্ছিল। এ সময় বেশ কয়েকবার বমি করেন তিনি। পুরো শরীর কাঁপছিল এবং কথা বলতেও বেশ বেগ পেতে হচ্ছিল তাকে। জানা গেল, সারা দিনে মাত্রাতিরিক্ত পর্যায়ে পানি পান করেছিলেন তিনি।’

শারীরিক সহিষ্ণুতা নির্ভর খেলাধুলা এবং এমডিএমএর মতো কিছু ওষুধ ব্যবহারের ফলে অতিরিক্ত পিপাসা পেতে পারে। এ সময় সংশ্লিষ্টদের মধ্যে মাত্রাতিরিক্ত পানি পানের প্রবণতা দেখা দেয়, যা হয়ে উঠতে পারে মৃত্যুর কারণ।

মাত্রাতিরিক্ত পানি পানের ফলে শরীরে যে বিষক্রিয়া দেখা দেয়, তার লক্ষণগুলো হলো— বমি বমি ভাব, বমি ও মাথাব্যথা। পরিস্থিতি খারাপ হলে মস্তিষ্ক ফুলে যাওয়া, মানসিক হতভম্বতা, স্ট্রোক, কোমা এমনকি মৃত্যুর মতো ঘটনাও ঘটতে পারে।

দেখা গেছে, হাইপোন্যাট্রেমিয়া বা অতিরিক্ত পানিজনিত বিষক্রিয়ায় রক্তে লবণের মাত্রা কমে যাওয়া রোগীদের ক্ষেত্রে মৃত্যুহার প্রায় ৩০ শতাংশ।

অতিরিক্ত পানিজনিত বিষক্রিয়ার শিকার ওই রোগী নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন এভাবে, ‘আমার যত দূর মনে পড়ে, আমাকে যত প্রশ্ন করা হচ্ছিল, আমি তার সুনির্দিষ্ট কোনো উত্তর দিতে পারছিলাম না। মনে পড়ছে আমার সঙ্গীকে বেশ বিবর্ণ ও নিরাশ দেখাচ্ছিল। বিষয়টিকে আমার শারীরিক অবস্থার চেয়েও ভীতিকর মনে হচ্ছিল। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় ছিল, আমি মোটেও অনুধাবন করতে পারছিলাম না, আসলে কী ঘটছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমার মনে পড়ে, চোখের সামনে হাত দুটো বেশ অস্বাভাবিকভাবে কাঁপছিল। ভেবে অস্থির লাগছিল, বিষয়টিকে থামাতে পারছি না কেন? একটা পর্যায়ে বুঝতে পারলাম, আমার আসলে গোটা শরীরটাই কাঁপছে।’

যুক্তরাজ্যভিত্তিক রয়েল কলেজ অব জেনারেল প্র্যাকটিশনার্সের ক্লিনিক্যাল ইনোভেশন অ্যান্ড রিসার্চ বিভাগের চেয়ারম্যান ডা. ইমরান রাফি জানান, শরীরে পানির মাত্রা বজায় রাখার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান খুবই জরুরি। যদিও সর্বোচ্চ কতটুকু পানি পান নিরাপদ, এ বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট মাত্রা নির্ধারণ করা নেই।

পানি
পানি

তিনি বলেন, শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা বজায় রাখতে পর্যাপ্ত পানি পান জরুরি। একই সঙ্গে মানুষের শরীরেও পর্যাপ্ত পরিমাণ পানির উপস্থিতি অপরিহার্য। বিশেষ করে যেসব পরিস্থিতিতে পানিশূন্যতা দেখা দিতে পারে, সেসব ক্ষেত্রে তো আরো বেশি। গরম আবহাওয়া, শারীরিক পরিশ্রম বা মূত্রের রঙ গাঢ় হলে আমি রোগীদের আরো বেশি করে পানি পানের পরামর্শ দেব। কারণ এগুলো পানিশূন্যতার লক্ষণ।’

ডা. ইমরান রাফি বলেন, ‘তবে অতিরিক্ত পানি পানের প্রভাব যে মারাত্মক হতে পারে, তা মেডিকেল কেস রিপোর্টের ঘটনাটিতেই পরিষ্কার। স্বাস্থ্যসেবা-সংশ্লিষ্ট ও রোগীদের ক্ষেত্রে বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত।’

যুক্তরাজ্যের সরকারি স্বাস্থ্যসেবা সংস্থা পাবলিক হেলথ ইংল্যান্ডের পরামর্শ অনুযায়ী, প্রতিটি ব্যক্তির দৈনিক পানি পানের পরিমাণ হওয়া উচিত সর্বনিম্ন ছয় এবং সর্বোচ্চ আট গ্লাস।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here