অপরূপা সাতছড়ি

অপরূপা সাতছড়ি।

সাতটা ছড়ি বা ছড়া যে বনের মাঝ দিয়ে বয়ে গেছে তারই নাম সাতছড়ি বন। বলছি হবিগঞ্জের চুনারুঘাটের ছোট রেইন ফরেস্টের কথা। পাখি আর প্রকৃতি প্রেমীদের কাছে বনটি বিশেষভাবে সমাদৃত। কারণ বনটি ছোট হলেও ছোট নয় এর জীববৈচিত্র্য। এটা বন্য পশু-পাখি সমৃদ্ধ একটি জঙ্গল। একদিন পত্রিকায় দেখলাম ঢাকা থেকে দিনে গিয়ে দিনে ফিরে আসা যায় ওই বন থেকে। বিষয়টি মাথায় ঢুকে গেল। বন্ধুদের নিয়ে বন পাহাড়ে ভ্রমণের গল্প শুনতে শুনতে মেয়ে বন্ধুরা প্রায়ই আফসোস করত। যেহেতু এ ট্যুরটা স্বল্প সময়ের, তাই অতি উৎসাহী দুজন মেয়ে সদস্য এ যাত্রায় শামিল হয়ে গেল। শুরু হলে আমাদের পথ চলা খুব সকালে সায়েদাবাদ থেকে হবিগঞ্জগামী বাসে উঠে সাড়ে তিন ঘণ্টার মধ্যে মাধবপুরের মুক্তিযোদ্ধা মোড়ে এসে নামলাম। সেখান থেকে চুনারুঘাটের লোকাল বাস ধরে আধা ঘণ্টায় সাতছড়ি বনের মূল গেটে চলে এলাম। মুক্তিযোদ্ধা মোড় থেকে এটুকু পথে বাড়তি পাওনা ছিল রাস্তার ধারে বিক্ষিপ্তভাবে ছড়ানো চা বাগানগুলো। ততটা গোছানো না হলেও দেখতে খারাপ লাগেনি।

বনে প্রবেশের জন্য জনপ্রতি টিকেট কিনলাম। অদূরে বিশাল সাইন বোর্ডে লেখা আছে বিভিন্ন তথ্য কণিকা, সতর্ক বার্তা আর দেয়া আছে বন পরিদর্শন ট্রেইলের বিবরণ। ট্রেইল হলো বনের মধ্য দিয়ে নিরাপদে হাঁটার নির্বাচিত পথ। বন বিভাগের একজন মহিলা কর্মীর কাছে পথের দিশা জানতে চাইলাম। তিনি অফিসের পেছনের দিকের রাস্তাটা দেখিয়ে দিলেন। দেখানো পথে হাঁটার কিছুক্ষণের মধ্যে বুঝতে পারলাম আমরা বনে ট্রেইলের পরিবর্তে রীতিমতো ট্রেকিং করে ধীরে ধীরে উঁচুতে উঠছি। বেশ কষ্ট করে একটা উঁচু স্থানে এসে সারি সারি পাম গাছ দেখতে পেলাম। সেখানে একজন ভদ্রলোক দীর্ঘদেহী একজন শ্রমিক দিয়ে পাম গাছগুলো পরিচর্চা করছেন। শ্রমিকের হাতে ছিল তিন ফুটের চেয়ে বড় একটা রাম দা। ভয়াবহ অবস্থা। আমাদের এ পথে দেখে উনি খুবই অবাক হলেন আর বললেন আপনাদের ভুল পথ দেখানো হয়েছে। পরিচয় পর্বের পর জানলাম তিনি ঢাকায় থাকেন। বন বিভাগ থেকে জমি লিজ নিয়ে পাম গাছগুলো লাগিয়েছেন। বেহাল অবস্থায় ওনার পরামর্শ চাইলাম। বললেন এখানে গাইড পাওয়া মুশকিল! তবে আপনারা চাইলে সাদেক নামের এই লোকটাকে আপনাদের সঙ্গে দিতে পারি। তিনি আমাদের আশ্বস্ত করলেন পুরো বনটা তার নখদর্পণে। সাদেককে নিয়ে নতুন করে জঙ্গল অভিযান শুরু হলো। সে প্রশিক্ষিত গাইড না হলেও বনে বসবাসের কারণে সাতছড়ি বন সম্পর্কে প্রচুর অভিজ্ঞ। প্রথমেই সে বানরের বিচরণ ক্ষেত্র দেখাতে চাইল। বনে এলেই এ প্রাণীটার এত বেশি দেখা মেলে বলে আগ্রহী হলাম না। বললাম তার চেয়ে বরং তিন কিলোমিটারের ট্রেইলরটাই দেখাও।

পাখির বাসা।
পাখির বাসা।

শুরুতেই একটা ছোট্ট ছড়া পার হতে হলো। পানি নেই তবে নরম বালুতে পা দেবে যাচ্ছিল বার বার। আগেই বলেছি বনটি বিচিত্র প্রাণীতে ভরপুর। তাই তাদের দেখা পেতে হলে পা টিপে টিপে চলা আর নীরবতা ছাড়া উপায় নেই। কিন্তু বিষয়টি আমাদের সঙ্গে থাকা মেয়েদের মানাতে বেশ বেগ পেতে হলো। একটু গভীরে যেতেই প্রচুর পাখির ডাক কানে ভেসে আসতে লাগল। এরই মধ্যে বেশ কিছু পাখি আমাদের মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যেতে দেখলাম। কিছুক্ষণ নীরবে চলার পথে হঠাৎ উচ্চৈঃস্বরে অচেনা প্রাণীর অনবরত ডাক বন কাঁপিয়ে তুলল! সাদেক জানাল এটা উল্লুকের চিৎকার! হয়ত নিজেদের মধ্যে ঝামেলা পাকিয়েছে। দেখার জন্য সে দিকটায় পা বাড়ালাম, কিন্তু এখানটায় বন বেশ ঘন আর পথ না থাকায় এগুনো গেল না। আবার মূল ট্রেইলে চলে এলাম। বড় বড় গাছগুলোর গায়ে জন্মেছে নানা জাতের অর্কিড। ছোট টিলা কেটে পায়ে চলার পথ বানানো হয়েছে। সে পথের দু’ধারে লতা গুল্ম পরিপূর্ণ। সূর্যের আলো প্রবেশের সুযোগ নেই! তাই রাস্তাটা স্যাঁতসেঁতে, প্রচুর শ্যাওলা জন্মেছে আর অত্যধিক পিচ্ছিল। এখানটায় বুনো গাছ আর মাটির সেঁদো গন্ধে একাকার হয়ে গেছে। পিচ্ছিল রাস্তায় চলার জন্য সাদেক তার বিশাল দা দিয়ে বাঁশের কঞ্চি কেটে আমাদের প্রত্যেকের জন্য লাঠি বানিয়ে দিল। কোথাও কোথাও পথের লতাপাতা পরিষ্কারের জন্য সেগুলো বেশ কাজে লেগেছে। বেশ কিছু জায়গায় বর্ণিল ফার্নগুলো বনের শোভা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

 বুনো ফুলের ওপর রঙিন প্রজাপতির মাতামাতি।
বুনো ফুলের ওপর রঙিন প্রজাপতির মাতামাতি।

বনের কিছু কিছু অংশ একটু বেশি সুন্দর। দেখলাম নাম না জানা অসংখ্য বুনো ফুলের ওপর রঙিন প্রজাপতির মাতামাতি। পুরো বনটাই পাখির ডাকে মুখরিত !তবে থেমে থেমে ডাকা ঘুঘুই মনকে বেশ নাড়া দিয়েছে। ঝোপঝাড় আর গাছের ডালে ডালে অনেক অচেনা সুন্দর সুন্দর পাখির দেখা মিলল।

বনের মধ্যে ছিল বেতের ঝোপ, আর বনের কিনারায় ছিল লেবুর বিশাল বাগান। সিলেট অঞ্চলে প্রচুর বেত আর লেবু জন্মায়। বন দেখতে যেতে সঙ্গে নিয়েছিলাম পানির বোতল, প্যাকেটজাত বাদাম, খেজুর, বিস্কুট আর কিছু চকোলেট। শান্ত স্নিগ্ধ ছায়াময় সুনিবিড় প্রকৃতির মাঝে এতটা পথ হেঁটেও আমরা কেউই তেমন ক্লান্তি অনুভব করিনি। প্রকৃতি বড়ই প্রশান্তির স্থান। অদ্ভুত একটা রোমাঞ্চকর অনুভূতিকে সঙ্গে নিয়ে আবার সাতছড়ি বিট অফিসে ফিরে এলাম। পাশেই একটা রেস্তরাঁয় দুপুরের খাবার খেয়ে পরে পথ ধরলাম ঢাকার।

লিখেছেনঃ মোঃ সাইফুল আলম।

 

 

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here