ঈদ চলতি

নীলিমা দোলা

ঈদ আসতে আর বেশি দিন বাকি নেই। এত দিন যাঁরা এই বুটিক থেকে ওই বুটিকে ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন নতুন পোশাকের সম্ভার দেখতে, আশা করি তাঁদের দেখা-দেখির পালা শেষ—এবার শুরু হবে কেনাকাটা। আর কেনাকাটা শুরুর আগে জেনে নেওয়া দরকার কোন পোশাকটা এবার ঈদের ফ্যাশনধারায় আছে এবং কোনটা নেই। জ্যাম ঠেলে ঈদবাজারে ঢুকে যেন তাড়াতাড়ি কিনে নিতে পারেন সময়োপযোগী পোশাক, এ জন্যই নকশা জানিয়ে দিচ্ছে এবারকার ঈদ ট্রেন্ড।

কাপড়ের উপাদান
ধীরে ধীরে ঈদ যত এগিয়ে আসছে, গরমও ততটাই বাড়ছে। আর এ কারণে ঈদ বলেই যেকোনো কাপড়ের পোশাক পরার সুযোগটাও আর নেই। তাই এ বছর সালোয়ার-কামিজ, পাঞ্জাবি, এমনকি শাড়ি বা বাচ্চাদের পোশাকেও বেশ ব্যবহূত হচ্ছে এন্ডি সুতি ও এন্ডি সিল্কের কাপড়। মাঝারি মানের পোশাকের জন্য এন্ডি সুতি আর একটু দামি বা জাঁকালো পোশাকের জন্য এন্ডি সিল্কই চলছে এবং চলবে। এন্ডি কাপড় ব্যবহারে আরাম বলে এই ঈদে এন্ডির দিকেই সবার ঝোঁকটা বেশি থাকবে। গরমের কারণেই এবার অ্যান্ডির এত চাহিদা। জানালেন ফ্যাশন হাউস কে ক্র্যাফটের খালিদ মাহমুদ খান। এ ছাড়া ভয়েল কাপড় ও অর্গ্যান্ডি কাপড়ও বেশ চলছে।

সালোয়ার-কামিজ
মেয়েদের কামিজ এবার খুব লম্বাও হবে না, আবার খুব একটা খাটোও হবে না। হাতে একটু স্বচ্ছ কাপড়ের ব্যবহার দেখা যাবে। হাঁটুর একটু নিচে গিয়েই থেমে যাবে কামিজের ঝুল। এই ঈদে কামিজের ঝুলে একটু কোনা বের হওয়া ফ্যাশন আসবে । হাতের স্বচ্ছ কাপড়ে মসলিন, নেট, হাফসিল্ক—এসবই প্রাধান্য পাবে। সালোয়ার-কামিজের নকশায় মেশিন এমব্রয়ডারিই বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে। সেই সঙ্গে দেদার চলছে স্ক্রিন প্রিন্ট। ঈদ উপলক্ষে এক্সক্লুসিভ একটা কামিজ তো সবাই কিনেই থাকেন, কিন্তু এর পাশাপাশি যে অন্যান্য সালোয়ার-কামিজ কেনা, সেগুলোয় স্ক্রিন প্রিন্টই বেশি যাচ্ছে বলে জানালেন বিবিয়ানার লিপি খন্দকার। সালোয়ারের কাটিংয়ে এখনো জনপ্রিয় চাপা সালোয়ার। তবে লক্ষ রাখতে হবে, সালোয়ার যেন নিচে নেমে কুঁচকে না থাকে। একদম টানটান থাকলেই বুঝতে হবে ফ্যাশনটা ঠিকঠাকমতো হচ্ছে। আর পায়ের কাছে সালোয়ারের বর্ডারের উচ্চতা হবে দুই বা তিন ইঞ্চি।
এই ঈদে সালোয়ার-কামিজ কেনার সময় সবারই প্রাধান্য থাকবে ঈদ বা আনুষ্ঠানিক দাওয়াত ছাড়াও পরা যায়, এমন সালোয়ার-কামিজে। এ কারণেই বেশি দেখা যাচ্ছে গজ কাপড় কিনে কামিজ বানানোর ধুম। হালের এই ফ্যাশন এখন বেশ চলছে। এমব্রয়ডারি করা অর্গ্যান্ডি গজ কাপড়। তৈরি করিয়ে নেওয়া কামিজের সঙ্গে শিফন, টাইডাই বা হাফসিল্কের ওড়না এখন ফ্যাশনেবল। একদম রং মিলিয়ে সালোয়ার-কামিজের চেয়ে বরং কামিজের নকশার মোটিফের সঙ্গে সালোয়ার মেলানোই অনেক বেশি ফ্যাশনেবল এ সময়। জানালেন ফ্যাশন ডিজাইনার মাহিন খান। ঢাকা নিউমার্কেটের সাজিয়া মাস্টার টেইলার্সের মাস্টার দেলওয়ার হোসেন জানালেন, এখনকার কামিজের টেইলারিং প্যাটার্নে এ লাইন কাটিং চলছে এবং কামিজে প্লিট ব্যবহার হচ্ছে। সেই সঙ্গে ফিটিংটা ঠিক রাখতে পেছনে চেইনের ব্যবহার চলছে।

ফ্যাশনে কুর্তা
বাজার ঘুরে দেখা গেল, এবার বেশ বিক্রি হচ্ছে কামিজ বা কামিজ স্টাইলের ফতুয়া বা কুর্তা। হাতের কাজ করা, স্ক্রিন প্রিন্ট, এমব্রয়ডারি ও লেইস লাগানো। এসব কুর্তার সঙ্গে প্যান্ট, ক্যাপ্রি, লেগিংস দিয়ে ব্যবহার করছে তরুণীরা। তাই এবারের ঈদ ট্রেন্ডে লুজ কামিজ, সালোয়ার ও ওড়নার বেশ দাপট রয়েছে।
ঈদ ফ্যাশনে যেকোনো পোশাকের ফিনিশিং দেখা যাবে কাতান, বেনারসি, দুপিয়ান সিল্কের মাধ্যমে। সালোয়ার-কামিজ, শাড়ির পাড়, ফতুয়া, কুর্তা, পাঞ্জাবি, এমনকি বাচ্চাদের পোশাকেও এই বৈশিষ্ট্যটি বিদ্যমান।
ঈদ উপলক্ষে একটা ভালো শাড়ি সবাই কিনে থাকেন। আর এই ভালো শাড়ির তালিকায় এবার থাকছে পিটানো কাজের কাতান, জামদানি, শিফন, লেইস ও জুট কাতানের শাড়ি। গরম বলেই হয়তো সবাই এবার হালকা ধরনের শাড়ির দিকে ঝুঁকছেন বা ঝুঁকবেন বলে মনে করেন মাহিন খান। শুধু শাড়িই নয়, এর সঙ্গে অর্নামেন্টেড ব্লাউজও এবারকার ফ্যাশন ট্রেন্ড। তাই কোনো বুটিককে দেখা যাচ্ছে আলাদা করে কেবল ব্লাউজই বিক্রি করছে। শিফন বা লেইসের শাড়িতে পাড় বসিয়ে সেটিকে জমকালো করার ফ্যাশনটা এবারের ঈদেও থাকবে। তবে এবারে পাড়ের ক্ষেত্রে কাতান বা চুমকির চেয়ে বেশি প্রাধান্য পাবে এমব্রয়ডারি করা পাড় বা লেইস। একটু দামি শাড়িতে অ্যান্ডির সঙ্গে মসলিন বা জুটের সঙ্গে হাফসিল্ক—এ ধরনের সমন্বয় দেখা যাবে। এমব্রয়ডারির পাশাপাশি রিবনওয়ার্কের শাড়ির বেশ চাহিদা দেখা যাবে। শাড়িতে এ বছরের ফ্যাশন ট্রেন্ডে অনেক বেশি ঐতিহ্যবাহী শাড়ির চাহিদাই বেশি দেখা যাবে। প্রিন্টেড শাড়ির ক্ষেত্রে ভাগে ভাগে নকশাই বেশি গুরুত্ব পাবে। তাই ব্লক বা স্ক্রিন প্রিন্টের ক্ষেত্রে দেখা যাবে কুঁচি, জমিন ও আঁচল—এই তিন জায়গায় তিন ধরনের নকশা চোখে পড়বে বলে জানালেন মাহিন খান।

রঙের ফ্যাশন
পোশাকের রঙের ক্ষেত্রে সব সময় উৎসবে যে রংগুলো ব্যবহার হয়, সেসব রং নয়, বরং একটু হালকা পেস্টাল শেডগুলো বেশি চলবে। পেস্ট সবুজ, জেড সবুজ, পিচ, হালকা গোলাপি, হালকা বেগুনি—এই রংগুলোই এবারের ঈদে বেশি দেখা যাবে।

শিশুদের জন্য আরাম
বাচ্চাদের পোশাকেও বেশ চলছে অ্যান্ডি কাপড়। বাড়ির বাচ্চাটির জন্য আরামদায়ক কাপড় কেনার আগ্রহ থাকে সবারই। আর তাই বাচ্চাদের পোশাকেও আরামের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে অ্যান্ডি, সুতি এবং প্রিন্টেড বিভিন্ন ভয়েল কাপড়ই বেশি চলছে। ছেলে বাচ্চাদের পোশাকের ক্ষেত্রে সকালবেলার নামাজের জন্য পাঞ্জাবি চাই-ই চাই। এই পাঞ্জাবি সুতি বা অ্যান্ডি কাপড়েরটাই এবার বেশি চলবে।
মেয়েশিশুদের এবারের পছন্দের তালিকায় থাকছে সালোয়ার-কামিজ। পুরোপুরি আনারকলি না থাকলেও থাকছে কলিদার কামিজ। বাচ্চাদের পোশাকে একটু লেইস এবং নানা ধরনের টুংটাং শব্দের ঘণ্টা লাগানোর প্রবণতা দেখা গেছে এবং এগুলোই শিশুদের ফ্যাশনে এগিয়ে থাকবে।

গয়নায় ঈদ
সোনা-রুপার গয়নার পাশাপাশি কয়েক বছর ধরেই পুঁতি, কড়ি, শেল, সুতা, কাঠ, পিতলসহ নানা ধরনের গয়নার প্রচলন দেখা যাচ্ছে। তবে এবার এসব গয়নার সম্মিলিত রূপটাই চোখে পড়বে। রঙয়ের বিপ্লব সাহা জানালেন, পুঁতির সঙ্গে ধাতু এবং হয়তো সেই সঙ্গে শেল বা সুতার মিশ্রণেও হতে পারে গয়নার নকশা। এভাবে কয়েকটি মাধ্যম একই সঙ্গে নিয়ে তৈরি হবে গয়না। একই সঙ্গে হাতে নানা রকমের বালা পরার ট্রেন্ড দেখা যাবে। এর সঙ্গে যুগপৎভাবে থাকবে বড় আংটিও। আর সোনা-রুপার গয়নায় ব্যবহার হবে প্রচুর পরিমাণ মুক্তা। উৎসবমুখী গয়নার পাশাপাশি এবারের গয়নার বাজারের বৈশিষ্ট্য, কাজের জায়গায় পরার উপযোগী ছোট নকশার গয়না।

পাঞ্জাবিতে কারচুপি
এবারের ঈদে ছেলেদের পাঞ্জাবিতে কোনো একটি নয়, বরং কয়েকটি ফ্যাশনের সমন্বয় দেখা যাবে বলে জানালেন খালিদ মাহমুদ খান। একদল চিরাচরিত সাদা পাঞ্জাবি পরবেন। একদল রঙিন একটুখানি হাতের কাজ করা পাঞ্জাবি পরবেন। কেউ কেউ অনেক কাজের পাঞ্জাবি পরবেন, আর কেউ বা পরবেন একটু ফ্যাব্রিকেটেড পাঞ্জাবি। একটু অন্য ধরনের বোতামের ব্যবহার লক্ষ করা যাবে। আর এ ধরনের পাঞ্জাবিগুলোই তরুণদের ফ্যাশন ট্রেন্ড। ঝুল খুব বেশি হবে না, তবে কাটিং প্যাটার্নের দিক থেকে ষোলআনা ফ্যাশনেবল। তবে ছেলেদের পাঞ্জাবিতেও সূক্ষ্ম কারচুপি কাজের ব্যবহার দেখা যাবে। একটু একটু গরম বলে ফ্যাশন ট্রেন্ডে প্রিন্টেড শার্ট দেখা যাবে অনেক বেশি। জানালেন বাংলার মেলার এমদাদ হক।

চুল বাঁধার সাজগোজ
এবারের ঈদের হেয়ার স্টাইলটা কেমন হবে—এই জিজ্ঞাসাটা নিশ্চয়ই অনেকেরই। তাঁদের জন্য রূপবিশেষজ্ঞ কানিজ আলমাসের কাছে গিয়েছিল নকশা। তিনি জানালেন, এবার বাংলাদেশে রাজত্ব করবে কয়েকটি হেয়ার স্টাইল। প্রথমটি হলো ববকাট। এটি চেহারার সঙ্গে মানিয়ে এবং চুলের ধরন সিল্কি হলেই কাটা যাবে। অনেক লেয়ারে ঢেউ খেলানো লেয়ারকাট লম্বা চুলের জন্য। লম্বা চুল গরমে বেঁধে রাখতে ক্লাসি পনিটেইল হেয়ার স্টাইল। খুব ছোট নয়, আবার লম্বাও নয়—এমন চুল যাঁদের পছন্দ, তাঁরা দিতে পারেন অ্যাসিমেট্রিক কাটিং। আর খুব অল্প বয়সীদের জন্য তো বব ও ব্যাঙসকাট তো আছেই। কানিজ আলমাসের মতে, এবারের ঈদে মেকআপ ট্রেন্ড হলো স্মোকি আই, লাল লিপস্টিক, রঙিন আইশ্যাডো, ন্যাচারাল মেকআপ। সেই সঙ্গে ফাউন্ডেশন হলো মিনারেল।

পায়ে পায়ে ঈদ
গত কয়েক বছরের ধারাবাহিকতায় এবারের ঈদেও পায়ের ফ্যাশনে থাকছে ফ্ল্যাট স্যান্ডেল। দুই ফিতার পাথর বসানো রংবেরঙের স্যান্ডেলেই ঈদ সারবে তরুণীরা। রাখী সুজের তাজুল ইকবাল মোহাম্মদ জানালেন, হিল জুতার চেয়ে ফিতাসহ চটি জুতার চাহিদাই বেশি। মাহিন খানও মনে করেন, অনেক ফিতার গ্ল্যাডিয়েটর স্যান্ডেলের চাহিদা আছে এবার।

অন্দরসজ্জায়
অন্দরসজ্জায় এবারের ট্রেন্ডেও দেশীয় মোটিফের পর্দা, কুশন কভার ও বিছানার চাদর প্রাধান্য পাবে। তবে লেইস ও স্ক্রিন প্রিন্টের ব্যবহার দেখা পাবে সর্বাধিক। একই পর্দায় লেইস ও স্ক্রিন প্রিন্ট—এমনটা খুব স্বাভাবিক বলে জানালেন আড়ংয়ের বিপণন ব্যবস্থাপক ফারজানা হালিম হাই। সেই সঙ্গে দেশীয় মোটিফের ঝাড়বাতি ও ল্যাম্পের ব্যবহার প্রচুর দেখা যাবে। ডিনারসেটে সাদা বা প্রচলিত রঙের বাইরে গিয়ে রঙিন সব ডিনারসেট দেখা যাবে। নানা রঙের বাতিও এখন অন্দরসজ্জার অন্যতম উপাদান হয়ে দাঁড়িয়েছে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here