এই ঈদে ঘুরে আসুন শান্ত নদী সোমেশ্বরীর পাড়ে

0
413

নদীর নাম সোমেশ্বরী। আমরা দাঁড়িয়ে ছিলাম নদীর তীরে। তীর ছেড়ে পা ফেললেই ধু ধু বালুচর। চরের পর নদীর পানি চিকচিক করছে রোদের আলোয়। সূর্যের উত্তাপ টের পেলাম বালুচরে পা রেখেই! শুধু গরম বললে ভুল হবে, তপ্ত উনুনে পা রাখার শামিল! তবে খানিক বাদেই আমাদের জন্য যে এত প্রশান্তি অপেক্ষা করছে, সেটা কে জানত?বিরিশিরি ছেড়ে আমাদের পরবর্তী গন্তব্য ছিল রানিখং এলাকায়। সেখানে গারোদের একটা স্কুল দেখার ইচ্ছা আমাদের। সেই সঙ্গে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের বিজয়পুর সীমান্ত ফাঁড়িটাও ঘুরে আসার পরিকল্পনা ছিল মাথায়। পাড়ি দিতে হবে সোমেশ্বরী নদী। তাই অমন তপ্ত বালুতে পা রাখা। এই তো আর কিছু দূরেই সোমেশ্বরী। কিন্তু পা রাখাই যে দায়! যাওয়া যাবে তো নদীর বুকে?
চরে থাকতেই নদীর ওপাশে একটা নৌকা চোখে পড়ল। আমাদের পাশ দিয়ে হুঁস করে বালু উড়িয়ে চলে গেল একটা মোটরসাইকেল। তাহলে কি সোমেশ্বরীর বুকে একই সঙ্গে নৌকা আর মোটরসাইকেল চলে? বিশাল এক ধাঁধা বটে!
কিছু দূর যাওয়ার পর সেই ধাঁধার উত্তর মিলল। নদীর ওপাশের খেয়ানৌকাটাই পারাপারের একমাত্র ভরসা। আমাদের পাশ দিয়ে মোটরসাইকেল চালিয়ে যিনি এলেন, তিনিও নদীর ওপারে যাওয়ার জন্য অপেক্ষমাণ। নদীর আরও খানিকটা সামনে যেতেই দেখা গেল, বুকসমান পানিতে দাঁপিয়ে বেড়াচ্ছে ওপাড়ের একদল শিশু-কিশোর। আমাদের মধ্য থেকে কেউ একজন প্রস্তাব দিল, ‘সোমেশ্বরীতে দুপুরের গোসলটা সেরে নিলে কেমন হয়?’ একবাক্যে রাজি। কিন্তু এত অল্প পানিতে…? এই দ্বিধাদ্বন্দ্ব কেটে গেল মিনিট খানেকের মধ্যে।somessori04
ঝুপঝাঁপ করে সবাই নেমে পড়লাম নদীর বুকে। নেমেই অবাক। সোমেশ্বরীর পানি অদ্ভুত রকমের ঠান্ডা! মনে হলো মাত্রই ফ্রিজ থেকে পানি এনে ঢেলে দেওয়া হয়েছে নদীতে। মাথার ওপর গনগনে সূর্য, উত্তাপে বাতাসও কাঁপছে! অথচ সোমেশ্বরীর পানি কী দারুণ ঠান্ডা! যেমন ঠান্ডা, তেমন স্বচ্ছ! এমন প্রাকৃতিক সুইমিংপুলে নামলে সাঁতার না-জানা মানুষও নাইতে চাইবে। তাই ঘণ্টা খানেক চলল আমাদের জলকেলি!
কিন্তু সোমেশ্বরীর বুকে বয়ে চলা এই স্বচ্ছ, ঠান্ডা পানির রহস্য কী? সূর্যের উত্তাপে যখন চারপাশ আগুন-গরম, তখন এই নদীর পানি এত ঠান্ডা থাকে কী করে? ঢাকায় এসে গুগল করে জানা গেল, ভারতের মেঘালয় রাজ্যের গারো পাহাড়ের বিঞ্চুরীছড়া, বাঙাছড়া প্রভৃতি ঝর্ণাধারা ও পশ্চিম দিক থেকে রমফা নদীর স্রোতোধারা একত্রিত হয়ে সোমেশ্বরী নদীর সৃষ্টি। ১৯৬২ সালে পাহাড়ি ঢলে সোমেশ্বরী দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত হয়ে নতুন গতিপথের সৃষ্টি করেছে, যা স্থানীয়ভাবে ‘শিবগঞ্জ ঢালা’ নামে পরিচিত। বর্তমানে এ ধারাটি সোমেশ্বরীর মূল স্রোতোধারা। এ স্রোতোধারাটি চৈতালি হাওর হয়ে জারিয়া-ঝাঞ্জাইল বাজারের পশ্চিম দিক দিয়ে কংস নদের সঙ্গে মিলেছে।
স্থানীয় লোকজন অবশ্য জানিয়েছেন, পাহাড়ি ঢলই মূলত সোমেশ্বরীর স্বচ্ছ ও ঠান্ডা পানির উৎস। আর স্রোতের কারণে পানি থিতু হওয়ারও সুযোগ পায় না। তবে ভরা বর্ষায় এই পানি এত স্বচ্ছ থাকে না।

যেভাবে যাবেন সোমেশ্বরীঃ

বিআরটিসির একটি স্পেশাল বাস প্রতিদিন বিকাল ৩.২০ তে কমলাপুর বিআরটিসি কাউন্টার থেকে ছেড়ে যায় যা ছয় ঘন্টার মধ্যে আপনাকে সুসং দুর্গাপুরের একবারে প্রানকেন্দ্র উকিলপাড়া মোড় এর তালুকদার প্লাজা/ অগ্রণী ব্যাংক এর সামনে পর্যন্ত নিয়ে যাবে। আপনি ইচ্ছা করলে ময়মনসিংহ হয়ে ভেঙ্গে ভেঙ্গেও আসতে পারেন। অবশ্য এতে ঝামেলা বেশি। “এনা” পরিবহন এর বাস মহাখালী হতে ময়মংসিংহ-এর মাসকান্দা বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত যায়। এনা’র ভাড়া ২২০ টাকা। এছাড়া শেরপুর এবং ফুলবাড়িয়ার কিছু বাসে করে আপনি ময়মনসিংহ ব্রীজ পর্যন্ত আসতে পারবেন। ভাড়া ৯০/১০০ টাকা। তবে এক্ষেত্রে আপনি কাউন্টার থেকে না উঠে টারমিনাল এর বাইরে হতে বাসে উঠবেন। সেখান থেকে সিএনজি তে করে দুর্গাপুর বাজার তালুকদার প্লাজার সামনে এসে নামবেন। এই বাস গুলার ভাড়া কম এবং সার্ভিসও খুবই ভাল। তবে খরচ কমানোর জন্য সব বাস কিন্তু উপযুক্ত নয়। শুধু শ্যামলী বাংলা(শেরপুর), ইমাম(হালুয়াঘাট), এবং আলমএশিয়া(ফুলবাড়িয়া)। এছাড়া অন্য কোন বাসে ভুল করেও উঠবেননা।সুসং দুরগাপুর থেকে যেকোনো ইজি বাইকে করে ১০০-১৫০ টাকার মধ্যে ঘুরে আসতে পারবেন সোমেশ্বরী নদী।

খাওয়াদাওয়াঃ

বাইরে ঘুরতে জাওয়ার প্রধান একটি আকর্ষণই থাকে খাবার। তবে দুঃখের বিষয়, সোমেশ্বরীর পাড়ে খুব উন্নতমানের কোন খাবার আপনি পাবেন না। একদিনের জন্য যদি ঘুরতে যান তবে বাসা থেকে খাবার নিয়ে যাওয়ায় ভাল। আর রাতে থাকার পরিকল্পনা থাকলে আপনাকে ইজি বাইকে করে ফিরে আসতে হবে কলসিন্দুর বাজার পর্যন্ত। ভাত, ডাল, মাছ, সবজি, মুরগি এসব সাদাসিধা খাবারের ব্যবস্থা আছে সেখানে। খরচ পড়বে ১০০-১৫০ টাকার মধ্যে। তবে বাইরের খাবার যথাসম্ভব বর্জন করাই ভাল।

এ তো গেল তথ্য-উপাত্ত দিয়ে ব্যাখ্যা। এর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাও নিশ্চয়ই আছে। তবে ব্যাখ্যাট্যাখ্যা নয়, সোমেশ্বরীতে একবার ডুব মানে আপনি এ নদীর প্রেমে আটকে গেলেন! সে কারণেই বারবার যেতে বাধ্য হবেন নেত্রকোনার বিরিশিরিতে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here