এই ঘরেই চাঁদের আলো

 

নগরীর নতুন রাস্তা মোড় থেকে বিআইডিসি সড়ক ধরে কিছুটা এগিয়ে গেলেই চোখে পড়বে বরিশাল সমিতির অফিস। পাশের সরু গলি দিয়ে ভেতরে গেলেই দোচালা টিনের ঘর। মুলিবাঁশের বেড়ার কিছু অংশ ঢেকে রাখা হয়েছে খবরের কাগজ দিয়ে। খুব আগ্রহ নিয়ে যারা যাচ্ছেন- ঢুকেই ধাক্কা খাচ্ছেন। ক্রিকেট বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তোলা ছেলেটির বাড়ি দেখে বিস্মিত হচ্ছেন সবাই।

অবশ্য মুহূর্তের মধ্যেই বিস্ময় মুছে যাচ্ছে মিষ্টিমুখের আতিথেয়তায়। যে-ই বাড়িতে আসছেন মিষ্টি নিয়ে ছুটে যাচ্ছেন মিরাজের বাবা জালাল হোসেন। কুশল বিনিময় করছেন। এখন শুধু কথা বলেই সবাই সন্তুষ্ট হয় না, তাই ছবিও তুলতে হচ্ছে। দু’দিন ধরে এ নিয়েই খুব ব্যস্ত সময় যাচ্ছে জালাল হোসেনের।

1477828858

এ সময় হঠাৎ করে ফোন বাজল। হ্যালো বলতে কিছুটা যেন কেঁপে উঠল গলা। এপাশ থেকে বুঝলাম ছেলের ফোন- ‘বাবা ভালো আছো তো?’ জবাবে মিরাজ কী বললেন শোনার সুযোগ হয় না আমাদের। মায়ের সঙ্গে কথা বলার জন্য ফোন চলে যায় ঘরের ভেতর।

কিছুটা অপ্রস্তুত মুখে জালাল হোসেন বললেন, মা ছাড়া কিচ্ছু বোঝে না। প্রতিদিনই মায়ের সঙ্গে কথা বলা তার চাই। নিজেই বলতে থাকেন, আমার বাবা গান পছন্দ করতেন। মিরাজের দাদার ইচ্ছা ছিল নাতি বড় হয়ে ভালো গান করুক। কিন্তু ওর ঝোঁক ছিল ক্রিকেটের প্রতি। এ নিয়ে অনেকবার বকাঝকা করছি-মারছি…। বলতে বলতে কেঁদে ফেলেন জালাল হোসেন।

413ae9ff71653ed520838d1fa1e9e2da-mirazbb

চোখ মুছে বলেন, অনূর্ধ্ব-১৫ দলে চান্স পাওয়ার পর থেকে আমি আর কিছু বলি না। নিজেই প্রশ্ন করেন, বলব কীভাবে? মিরাজ কি এখন আমার একার ছেলে। ও তো এখন সবার। সারাদেশের।

৩১, ৬২ বছরের রেকর্ড, ১২/১৫৯, ১৯ উইকেট- এমন কঠিন কঠিন পরিসংখ্যান দিয়ে যাকে ইতিহাসের নায়ক-মহানায়ক বানিয়ে দেওয়া হয়েছে, সেই মিরাজের বাড়ি কি হয়। সেটা দেখতেই সোমবার সকালে নগরীর দক্ষিণ কাশিপুরের মিরাজের বাড়িতে যাওয়া। বাড়িটির পোশাকি ঠিকানা প্লট নম্বর ৭, খালিশপুর নর্থজোন (বি), বিআইডিসি রোড খুলনা।

মিরাজের বাবার অভ্যর্থনার পর মায়ের সঙ্গে কথা বলতে ঘরে গিয়ে হতাশই হতে হলো। ধার্মিক মিনারা বেগম বাইরের কারও সঙ্গেই কথা বলেন না। দুই কক্ষের বাড়িতে একটি কক্ষে তিনি আড়ালেই বসে রইলেন। তার হয়ে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিলেন মিরাজের একমাত্র বোন রুমানা আক্তার মিম্মি।

তার কাছেই জানা গেল, খুলনায় বেড়ে উঠলেও মিরাজের জন্ম ও আদিনিবাস বরিশাল জেলার বাকেরগঞ্জের হলদিয়া গ্রামে। চালক বাবার চাকরির সূত্রেই ২০০১ সালে খুলনায় চলে আসা। তার পর থেকে ওই এলাকাতেই বসবাস।

মিম্মি জানান, হাজি শরিয়ত উল্লাহ স্কুলে পড়ালেখার সময়ই খেলাধুলার দিকে ঝুঁকে যান মিরাজ। খেলা শুরু করেন কাশীপুর ক্রিকেট একাডেমিতে। ওই একাডেমির সভাপতি শেখ খালিদ হাসানকে পাওয়া গেল সেখানেই। তিনি বলেন, ২০০৭ সালে খুলনা জেলা ক্রীড়া সংস্থা আয়োজিত অনূর্ধ্ব-১৩ খেলায় চ্যাম্পিয়ন হয়ে প্রথম পুরস্কার ওঠে মিরাজের হাতে। বর্তমানে ওই একাডেমির ক্রিকেট প্রশিক্ষক ও দলের ক্যাপ্টেন মিরাজ।

আলমারিতে সাজানো বিভিন্ন ট্রফি দেখিয়ে মিম্মি জানান, বাবা খেলা কিছুই বুঝতেন না। এজন্য বাধা দিতেন বেশি। তবে অনূর্ধ্ব-১৪ হয়ে বিভাগে খেলার পর থেকে বাবা আর বাধা দেননি। এখন সবাই খেলাধুলার ব্যাপারে মিরাজকে সহযোগিতা করেন।

দুপুরে আড়াইটার দিকে ফেরার সময়ও মিরাজের বাড়িতে ছিল মানুষের ভিড়। মিম্মি জানান, অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের সময়ও মানুষ ভিড় করেছিল। সাংবাদিকরা আসতেন। এজন্য মানুষের উচ্ছ্বাস স্বাভাবিকই লাগছে তাদের কাছে।

ফেরার সময় খালিশপুরের আসমা-সরোয়ার স্কুলের ৬/৭ জন ছাত্র এলো মিরাজের বাড়িতে। সপ্তম শ্রেণির ছাত্র সিয়াম, মেহেদী, রাবি্ব ও আকাশ জানায়, কাশিপুর প্রাইমারি স্কুল মাঠে মিরাজ ভাইয়ের সঙ্গে অনেক খেলেছি। কাল পাড়ার সবাই মিলে আমরা একসঙ্গে খেলা দেখেছি, আনন্দ করেছি। মিরাজ ভাইয়া তো আমাদের সবারই ভাই। ফেরার সময় মনে হচ্ছিল ছোট-বড় সব মানুষের ভালোবাসাই যার সম্বল, পৃথিবীতে তার আর কিছুর কি প্রয়োজন আছে?

সূত্রঃ হাসান হিমালয়, খুলনা ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here