এক ভাষাসৈনিক শরিফা খাতুনের গল্প

নতুন প্রজন্মের প্রতি এ ভাষাসৈনিকের আহ্বান, দেশের সেবার জন্য যেন তারা মনকে প্রস্তুত করে।

মহান ত্যাগের বিনিময়ে আজ যথাযথ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করা হয়েছে বাংলা ভাষাকে। পরবর্তীতে এর রেশ ধরেই বিপুল রক্তক্ষয়ের পর জন্মেছে বাংলাদেশ। নতুন প্রজন্মের প্রতি এ ভাষাসৈনিকের আহ্বান, দেশের সেবার জন্য যেন তারা মনকে প্রস্তুত করে। দেশকে ভালোবেসে, এর মানুষকে ভালোবেসেই যেন একে সুগঠিত করে গড়ে তোলে আগামী প্রজন্ম, এমনই চাওয়া ভাষাসৈনিক শরিফা খাতুনের।

জন্ম ১৯৩৬ সালের ৬ ডিসেম্বর বর্তমান ফেনী জেলার শশ্মাদি ইউনিয়নে হলেও বাবার চাকরির সুবাদে আসামেই থাকা হতো ড. শরিফা খাতুনের। ছোটবেলা কেটেছে আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ের কোয়ার্টারে। সেখানে পাহাড়ের ওপর গড়ে ওঠা ডিপো শহরের সৌন্দর্যের মাঝে অবস্থিত রেলওয়ে কোয়ার্টারগুলোর কথা আজো মনে পড়ে তার। চারপাশ ছিল জঙ্গলে ঘেরা। পাহাড়গুলোর মাঝ দিয়ে কখনো গেছে রেললাইন, কখনো আম, কাঁঠাল আর পেঁপে গাছের সারি। এর মাঝে কোনো কোনো গাছে ঝুলে থাকত উল্লুক, বানরসহ আরো কত প্রাণী। বাবার কোয়ার্টারের ভেতর কোথা থেকে একবার একটা হরিণ চলে আসে। সেবার ছোট্ট শরিফা খাতুন অবশ্য বেশ ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন। স্মৃতিগুলো আজো মনে করতে পারেন তিনি।

তবে এমন সবুজাভ স্নিগ্ধতায় জীবন কাটিয়ে দেয়া সম্ভব হয়নি শরিফা খাতুনের। কারণ তিনি জন্মেছিলেন এক ভীষণ সময়ে। মা-বাবার স্নেহের ছায়াতে আজীবন কাটিয়ে দেয়া সম্ভব নয়, জানতেন শরিফা খাতুনের বাবা মোহাম্মদ আসলাম এবং মা জেবুন্নেছা চৌধুরানীও। বাংলা ভাষাভাষীদের জন্য আসামে ছিল না কোনো স্কুল। তাই মেয়েকে মাত্র ছয় বছর বয়সেই কুমিল্লায় তার সেজো খালার বাসায় রেখে যান মা-বাবা। এ শরিফাই বড় হয়ে অংশ নেন বাংলা ভাষাকে যথাযোগ্য মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করার মহান আন্দোলনে।

সবুজাভ স্নিগ্ধতায় জীবন কাটিয়ে দেয়া সম্ভব হয়নি শরিফা খাতুনের।
সবুজাভ স্নিগ্ধতায় জীবন কাটিয়ে দেয়া সম্ভব হয়নি শরিফা খাতুনের।

কুমিল্লায় লুত্ফুন্নেসা স্কুলে শিশুশ্রেণীতে লেখাপড়ার শুরু ভাষাসৈনিক ড. শরিফা খাতুনের। তৎকালীন সমাজব্যবস্থার মধ্যে থেকেও মেয়ের পড়াশোনা নিয়ে বরাবরই সচেতন ছিলেন তার মা-বাবা। সচেতন ছিলেন শরিফা খাতুন নিজেও। ষষ্ঠ শ্রেণীতে ওঠার পর নোয়াখালী থেকে বৃত্তি পরীক্ষা দেন। বৃত্তি পেয়েও যান।

এসবের মাঝেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে ক্লাস বন্ধ হয়ে যায়। দেশভাগের পালা সামনে এসে উপস্থিত হয়। দেখতে পান দাঙ্গার ভয়ে অনেক পরিচিত হিন্দুর দেশ ছেড়ে চলে যাওয়া। আবার সব ভয় একপাশে সরিয়ে দিয়ে মাটি আঁকড়ে বসে থাকা মানুষগুলোকেও দেখেছেন।

এমন সময় নিজ দেশ আর নিজ ভাষা নিয়ে প্রথম চেতনাটা দানা বাঁধতে শুরু করে তার মনে। ১৯৪৮ সালে ড. শরিফা খাতুন ছিলেন উমা গার্লস হাইস্কুলের ছাত্রী। দেশভাগের পর পরই মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ যখন উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার জন্য ঘোষণা দেন, তখন পূর্ববঙ্গের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র ধর্মঘট পালিত হয়। সে সময় উমা গার্লস হাইস্কুলের ছাত্রীরাও বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে মিছিল বের করে। সে মিছিলে অংশ নেন শরিফা খাতুন। তিনি বলেন, ‘যখন বুঝতে পারলাম যে আমাদের বাংলাকে বাদ দিয়ে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করছে, সেটায় মনে আঘাত লেগেছিল।’

এ যুগের তুলনায় প্রচার মাধ্যমের বেশ স্বল্পতা ছিল তখন। তবুও ধীরে ধীরে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের কাজকর্ম সম্পর্কেও একটু-আধটু জানতে শুরু করেন তিনি। এরই মধ্যে উমা গার্লস হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করেছেন। ১৯৫১ সালে ভর্তি হন ইডেন কলেজে। এক বছর পর অর্থাৎ ১৯৫২ সালের জানুয়ারির শেষদিকে ঢাকা আসেন খাজা নাজিমুদ্দিন। ২৭ জানুয়ারি পল্টন ময়দানে জনসভায় দাঁড়িয়ে জিন্নাহর কথার সূত্র ধরেই নাজিমুদ্দিন উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার কথাই বলে যান। সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ আসে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের পক্ষ থেকে। শুরু হয় মিছিল-মিটিং। তাতে ইডেন কলেজের মেয়েরাও যখন যুক্ত হয়ে যান, তাদের সঙ্গেই আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন ড. শরিফা খাতুন।

ভাষা আন্দোলনের দিনগুলোর কথা বলতে গিয়ে যেন সেই দিনগুলোতেই আবার হারিয়ে যান ড. শরিফা। সে সময় স্কুলে স্কুলে গিয়ে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে আন্দোলনের প্রচারণা চালিয়েছিলেন শরিফা খাতুন, রওশন জাহান, জেবুন্নেসা, মনোয়ারা বেগমসহ অন্য ভাষাসৈনিকেরা। ‘রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই’ লেখা ব্যানার তৈরি করেছিলেন তারা বড় করে। তৈরি করেছিলেন ব্যাজ। সেগুলো বিলিও করেছেন সবার মাঝে।

দেশকে ভালোবেসে, এর মানুষকে ভালোবেসেই যেন একে সুগঠিত করে গড়ে তোলে আগামী প্রজন্ম, এমনই চাওয়া ভাষাসৈনিক শরিফা খাতুনের।
দেশকে ভালোবেসে, এর মানুষকে ভালোবেসেই যেন একে সুগঠিত করে গড়ে তোলে আগামী প্রজন্ম, এমনই চাওয়া ভাষাসৈনিক শরিফা খাতুনের।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির সকালবেলার কথা। ১৪৪ ধারা জারি হয়ে গেছে ততক্ষণে। তবে ইডেন কলেজের এ ছাত্রীদের লক্ষ আমতলার সভা। ‘আমরা সকালবেলা উঠে প্রস্তুত হয়েছি। আমাদের গেট কিন্তু তালাবদ্ধ। ভাবছি যে কী, কীভাবে যাব। তখন আমাদের মাঝে একজন বলল, চলেন আমরা ডাল বেয়ে, গাছ বেয়ে উঠে দেয়াল টপকে চলে যাই।’ এভাবেই সেদিনের কথা বর্ণনা করেন শরিফা খাতুন। যেই ভাবা সেই কাজ। তারা দেয়াল টপকে বেরিয়েই মেডিকেল কলেজের পাশ দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় চলে যান। তার পরের ইতিহাসটা সবারই জানা। সে ইতিহাসের চাক্ষুষ সাক্ষী হয়ে আছেন এ মহান ভাষাসৈনিক।

শরিফা খাতুন বলেন, সেদিন মনের চাওয়া আর আবেগে তাড়িত হয়েই আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন তিনি এবং তার মতো অনেকে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন বা নেতৃত্বের চেয়েও মুখ্য ছিল ভাষার প্রতি ছাত্র ও জনগণের ভালোবাসা। তিনি বলেন, ‘বাংলা ভাষার দাবি তো আমাদের প্রাণের দাবি। ওরা উর্দু চাপিয়ে দেবে, আমরা বাংলা কেন দেব? বাঙালির প্রয়োজনেই আমরা এ আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ি।’

২১ পরবর্তী সময়ে দেশের প্রথম শহীদ মিনার তৈরি করে তাতে যখন শ্রদ্ধা অর্পণ করা হয়, সেটিতেও অংশ নিয়েছিলেন শরিফা খাতুন। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত লড়াই করেছেন সহযোদ্ধাদের সঙ্গে।

মহান ত্যাগের বিনিময়ে আজ যথাযথ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করা হয়েছে বাংলা ভাষাকে। পরবর্তীতে এর রেশ ধরেই বিপুল রক্তক্ষয়ের পর জন্মেছে বাংলাদেশ। নতুন প্রজন্মের প্রতি এ ভাষাসৈনিকের আহ্বান, দেশের সেবার জন্য যেন তারা মনকে প্রস্তুত করে। দেশকে ভালোবেসে, এর মানুষকে ভালোবেসেই যেন একে সুগঠিত করে গড়ে তোলে আগামী প্রজন্ম, এমনই চাওয়া এ ভাষাসৈনিকের। তাঁকে  জানাই আন্তরিকভাবে সশ্রদ্ধ সম্মান, ভালোবাসা..

সূত্রঃ

লিখেছেন দেবযানী মোদক

ছবি: এস. এম. রহমান

বণিকবার্তা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here