ঘুমের ক্যাপসুল সিঙ্গাপুরে

সবচেয়ে মজার হচ্ছে এর বেডরুম।

কয়েক বছর আগে বিবিসি চ্যানেলে জাপানের ক্যাপসুল হোটেলের ওপর একটি ফিচার দেখেই কৌতূহলী আর আকৃষ্ট হয়েছিলাম এর প্রতি। ফিচারটিতে বলা হয়েছিল, জাপানের স্বল্প আয়ের ব্যাকপ্যাকার ট্যুরিস্ট আর বেকাররাই এ ক্যাপসুলের কাস্টমার। ধারণা করা হয়েছিল, জাপানি অর্থনীতির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গেই এ ক্যাপসুলের বিলুপ্তি ঘটবে। কিন্তু তা তো হয়ইনি বরং জাপান থেকে এ আইডিয়া ছড়িয়েছে বিশ্বের অন্যান্য দেশে। হিথরো বা মিউনিখ এয়ারপোর্টে ‘ন্যাপক্যাপ’, ‘ন্যাপক্যাব’, ‘স্লিপিং পড’সহ ভিন্ন ভিন্ন নাম নিয়েছে ক্যাপসুল হোটেল। যদিও এই ন্যাপক্যাপ আর ব্যাকপ্যাকারদের সীমার মধ্যে নেই। কেন জানি ওরা অভিজাত হোটেলের চেয়েও বেশি টাকা ধার্য করেছে। অবশ্য এয়ারপোর্টের ন্যাপক্যাপগুলো ব্যাকপ্যাকারদের টার্গেট করে করা হয়নি। উড়োজাহাজ যাত্রীদের কানেকটিং ফ্লাইটের দীর্ঘ বিরতিতে যারা লাগেজসহ নিরাপদে একটু ঘুমিয়ে নিতে চান, তারাই এসব ন্যাপক্যাপের টার্গেট কাস্টমার। তবে এখন সস্তা দামের ক্যাপসুল হোটেল পুরো ইউরোপে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। বিবিসির ফিচারটি দেখার পর থেকেই কোথাও ঘুরতে গেলে ক্যাপসুল হোটেলে রাত্রিযাপন থাকে আমার সবচেয়ে আকাঙ্ক্ষিত। যদিও প্রথম সুযোগটা এসেছিল অনেক পরে। কারণ এর আগে যতবারই ক্যাপসুল হোটেলে হানা দিয়েছি, তাদের সব রুমই বুকড থাকত।

এই ন্যাপক্যাপ বা ঘুমের ক্যাপসুল সম্পর্কে আগে একটু ধারণা দিই। ১৯৭৯ সালের কথা, জাপানের ওসাকা নগরীতে বসেছে ‘ওয়ার্ল্ড ফেয়ার’ নামের আন্তর্জাতিক একটি মেলা। দেশটির বড় বড় শহরে তখন ‘সনা স্পা’ ধরনের চেইন হোটেল ব্যবসায় চলছে রমরমা অবস্থা। হোটেলের খরচের ভয়ে মানুষের ঘোরাঘুরিই বন্ধ হওয়ার মতো অবস্থা। কিন্তু মেলার লোক সমাগম বাড়াতে হলে তো সস্তায় আবাসন মেলাতে হবে। এ চিন্তা থেকেই জাপানি স্থপতি নরিয়াকি করোকাওয়াকা সর্বপ্রথম ক্যাপসুল হোমের আইডিয়া দেন এবং মেলা উপলক্ষে অস্থায়ী ক্যাপসুল হোটেল বানানো হয় ওসাকার অমেদা এলাকায়। এটা ব্যবসাসফল হলেও রক্ষণশীল সংস্কৃতির কারণে জাপানিদের এ পদ্ধতি স্বাভাবিকভাবে নিতে অনেকটা সময় লাগে। ১১ বছর পর চালু হয় জাপানের প্রথম স্থায়ী ক্যাপসুল হোটেল। এখন দেশটির সব শহরেই ক্যাপসুল হোটেলের ছড়াছড়ি।

 একটি ক্যাপসুল হোটেলে এক রাত থাকার খরচ ওই এলাকার সাধারণ হোটেল থেকে তুলনামূলকভাবে অনেক কম।
একটি ক্যাপসুল হোটেলে এক রাত থাকার খরচ ওই এলাকার সাধারণ হোটেল থেকে তুলনামূলকভাবে অনেক কম।

ক্যাপসুল হোটেলগুলোর অবস্থান হয়ে থাকে সাধারণত অভিজাত এলাকায়। একটি ক্যাপসুল হোটেলে এক রাত থাকার খরচ ওই এলাকার সাধারণ হোটেল থেকে তুলনামূলকভাবে অনেক কম। খরচ কম হলে কী হবে, এখানে থাকে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা। কিছু কিছু সুবিধা বরং দামি হোটেলের চেয়েও বেশি। যেমন নিজেই বাজার করে রান্না করতে চাইলে ওদের রান্নাঘর আর হাঁড়িপাতিল ব্যবহার করতে পারবেন বিনা পয়সায়। সেসঙ্গে ওয়াশিং মেশিন, ওয়াশিং পাউডার আর আয়রন করে নিতে চাইলে তাও পারবেন পয়সা ছাড়াই। কিন্তু কীভাবে এত খরচ কম রাখা হয়? এখানে একটি সাধারণ হোটেলের চেয়ে অনেক বেশি বোর্ডারের থাকার ব্যবস্থা থাকে এবং সব সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করতে হয় ভাগাভাগি করে, যথানিয়মে। বুঝতেই পারছেন, এখানে শুধু উৎসর্গ করতে হবে আপনার আল্ট্রা প্রাইভেসি আর যখন-তখন যা খুশি তাই করার অভ্যাস। আল্ট্রা প্রাইভেসি বলছি এজন্য যে স্বাভাবিক প্রাইভেসি রক্ষা করা হয়।

আপনার জন্য শেয়ারিং ডাইনিং রুম থাকবে একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত। ওই সময়ের পর আপনাকে খাবার সার্ভ করা হবে না। তখন সেই রুমই ব্যবহার হবে রিডিং রুম কিংবা মিটিং রুম হিসেবে। এখানে কোনো সংযুক্ত বাথরুম নেই। এমনকি টয়লেট আর বাথরুমও থাকবে আলাদা। সবচেয়ে মজার হচ্ছে এর বেডরুম। এখানেও আপনাকে অনেক মানুষের সঙ্গে শেয়ারিং করতে হবে। প্রতিটি বিছানার সঙ্গে একটি করে টেলিভিশন ও কম্পিউটার রয়েছে। থাকে ওয়াই-ফাই কানেকশন। শুধু ঘুম, টিভি দেখা আর নেট ব্রাউজ ছাড়া অন্য কিছুই করতে পারবেন না এখানে। টিভি দেখতে হবে হেড ফোন ব্যবহার করে। বেডরুমে গল্পগুজব, খাওয়াদাওয়া একদম নিষিদ্ধ। বোর্ডার ছাড়া রুমে অন্য কেউ প্রবেশ করতে পারবে না।

mm

এক সিম্পোজিয়ামে যোগ দিতে গিয়ে একটা বিজ্ঞাপন দেখেই সিদ্ধান্ত নিলাম, অন্তত এক রাত কাটাব সিঙ্গাপুরের কোনো ক্যাপসুল হোটেলে। অনলাইনে বুকিং দিলাম। এয়ারপোর্ট থেকে ট্যাক্সি নিলাম, সে হোটেলটি চিনল না। গুগলে প্রদর্শিত জায়গায় ট্যাক্সি নিয়ে ঘুরছি কয়েকবার। কিন্তু খুঁজে পাচ্ছি না। ট্যাক্সি ড্রাইভারকে রাগান্বিত হয়ে বললাম, এইটুকুন একটা দেশ তোমার, তো সবকিছু চিনে ফেলার কথা এক বছরের মধ্যে। আর তুমি ট্যাক্সি চালাও ১০ বছর ধরে। সে একটু লজ্জিত হয়ে বলল, ওদের মোবাইল নম্বর থাকলে দেন চেষ্টা করে দেখি। নম্বরে কল দিয়ে জানলাম, আমরা আসলে ওই বিল্ডিংয়ের নিচেই আছি!

ওইটুকু জায়গায় থাকতে স্বাচ্ছন্দ্য কেমন হবে, তা নিয়ে কিছুটা সন্দিহানও ছিলাম। তাই আগে দেখে নিতে চাইলাম সুবিধাগুলো। কিন্তু না, সে সুযোগ নেই। একদিনের ভাড়া পরিশোধ করে, বোর্ডিং ফর্ম পূরণ না করে ওই ফ্লোরে যেতেই পারবেন না, এমনকি ওই ফ্লোরে লিফটও থামবে না। সুইচ চাপলে লিফটের স্পিকার থেকে আওয়াজ হয়, ‘আপনি এই ফ্লোরে প্রবেশের অনুমতিপ্রাপ্ত নন’। এভাবেই নিরাপত্তা ব্যবস্থাটা সাজানো হয়েছে। আপনাকে লিফটে প্রবেশ করে সেন্সরের ওপর আপনার রুমের কার্ড (ওটাই আপনার রুমের এবং আপনার লকারের চাবিও) স্পর্শ করাতে হবে। তবেই লিফটের ওই ফ্লোরের সুইচ কার্যকর হবে। কী আর করা! অগত্যা ফর্ম পূরণ করে নিলাম।

ফ্রন্ট ডেস্ক থেকে এক রোবট মহিলা আমাকে জানালেন, এই ন্যাপক্যাপ বা ঘুমের ক্যাপসুল হচ্ছে সিঙ্গাপুরের প্রথম ক্যাপসুল হোটেল। যে কয়জন নারী ফ্রন্ট ডেস্কে বসেন, তারা মনে হয় হাসতে জানেন না। প্রয়োজনের বাইরে কথা বলা যেন বারণ পুরো সিঙ্গাপুরেই। কিন্তু আমি তো থামার পাত্র নই। কথা চালিয়ে গেলাম। নানা প্রশ্নবাণে একজনকে জর্জর করে ফেললাম। তিনি সুন্দরভাবে সব প্রশ্নের উত্তরের জন্য আগে থেকেই প্রিন্টেড একেকটা লিফলেট ধরিয়ে দিচ্ছেন। দেখলাম, জানতে চেয়ে কোনো লাভ হবে না, তাই জানাতে শুরু করলাম আমার দেশ সম্পর্কে, জানালাম আমাদের ইকোট্যুরিজমের সম্পর্কে আগ্রহী বর্ধিষ্ণু জনগোষ্ঠীর কথাও। তাছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের মতো অনেক বাংলাদেশী শ্রমিক কাজ করেন সিঙ্গাপুরে, তারা মধ্যপ্রাচ্যের মতো বাংলাদেশীদের অবজ্ঞার চোখে দেখেন না। তিনি অকপটে স্বীকার করে নিলেন তাদের বড় বড় স্থাপনায় আমাদের শ্রমিকদের অবদানের কথা।

আমাকে অপেক্ষা করতে হবে বেলা ২টা পর্যন্ত। ওটাই চেক ইন টাইম। আগের বোর্ডার এখনো তার সিট ছেড়ে যাননি। আমি ফ্রেশ হয়ে ওদের কাছে স্যুটকেস রেখে আমার সিম্পোজিয়ামের বক্তৃতা শেষ করে ফিরে এলাম। আমি এমনিতেই মানুষের সঙ্গে মিশতে ভালোবাসি। ক্যাপসুল হোটেলগুলোয় সাধারণত ব্যাকপ্যাকারদের আনাগোনা বেশি হয়, তাই বন্ধুত্ব করার জন্য ক্যাপসুল হোটেলই সেরা। প্রথম দিনেই কয়েকজনের সঙ্গে আমার বেশ বন্ধুত্ব হয়ে গেল। চায়নিজ একজন বন্ধুর সঙ্গে সিঙ্গাপুরের চায়না টাউন এলাকাসহ আরো কিছু জায়গা ঘুরে এলাম। পরদিন সকালে ফ্রি নাশতা করতে গেলে ফ্রন্ট ডেস্কের সেই রোবট মহিলা আমাকে কাউন্টারে দেখা করতে বললেন। গিয়ে তার কথা শুনে তো আমি অবাক। আমার একদিনের বিল কমপ্লিমেন্টারি মওকুফ করা হয়েছে। আগের দিনের পরিচয়ের সুফল পেলাম হাতেনাতে।

একজন প্রকৃতিপ্রেমী ব্যাকপ্যাকার হওয়ার কারণে সিঙ্গাপুর কখনই আমার ভ্রমণের গন্তব্য ছিল না এবং হয়তো হবেও না কোনোদিন। পুরো দেশটাই যেন একটা অ্যামিউজমেন্ট পার্ক। তবে জীবনের প্রথম ক্যাপসুল হোটেলে থাকার অভিজ্ঞতাসহ আরো কয়েকটি কারণে দেশটি আমার হূদয়ের একটা বিশেষ জায়গা দখল করে রাখবে নিঃসন্দেহে।

লেখক: ডা. ইমরুল হাসান ওয়ার্সী

অ্যাডভেঞ্চার ট্রাভেলার, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ

2 COMMENTS

  1. It’s the best time to make some plans for the long run and it is time to be happy.
    I have read this publish and if I could I desire to recommend you few fascinating
    issues or tips. Perhaps you can write subsequent
    articles referring to this article. I wish to read even more
    things approximately it!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here