জলবায়ু পরিবর্তনে নাকের গড়নও বদলে যায়

নাকের গড়নের পার্থক্যের সাথে আবহাওয়া ও জলবায়ুর পার্থক্যের সম্পর্ক রয়েছে।

বায়ু মণ্ডলের তাপমাত্রা, বায়ুচাপ, বায়ু প্রবাহ, আদ্রর্তা (জলীয় বাষ্পের আপেক্ষিক পরিমাণ), বৃষ্টিপাত এগুলো আবহাওয়া ও জলবায়ুর উপাদান। আবহাওয়া ও জলবায়ুর উপাদান মূলত একই। কোন স্থানের বায়ুমণ্ডলের স্বল্পকালীন অবস্থাই আবহাওয়া। আর কোন স্থানের অনেক বছরের আবহাওয়ার বা বায়ুমণ্ডলের গড় অবস্থাই জলবায়ু।
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে নানারকম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে মানুষ। বিশ্বখ্যাত স্বাস্থ্য সাময়িকীতে, বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য-প্রভাব নিয়ে করা তাদের বিভিন্ন গবেষণা রিপোর্টে জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাবে বিভিন্ন রোগের প্রকোপ দেখা দেয়ার পাশাপাশি শরীরের নাকের গড়নেও পরিবর্তন হচ্ছে বলে ধারণার কথা উল্লেখ করেছেন।  সাধারণত মানুষ নাকের গড়ন পায় বাবা-মার কাছ থেকে- এতে কোনো সন্দেহ নেই। এই গড়নটি কিন্তু আগে থেকেই এরকম ছিল না। বিভিন্ন আবহাওয়া ও জলবায়ুর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে নিতে পূর্ব পুরুষ নাকের এমন গড়ন পেয়েছে।

তাপমাত্রা এবং আর্দ্রতার সাথে নাকের গড়নে বৈচিত্র্য দেখা গেছে।
তাপমাত্রা এবং আর্দ্রতার সাথে নাকের গড়নে বৈচিত্র্য দেখা গেছে।

সাম্প্রতিক এক গবেষণায় এমন ধারণার পক্ষেই জোরালো প্রমাণ পাওয়া গেছে। বৃহস্পতিবার (১৬ মার্চ) প্লস জেনেটিকস (PLOS Genetics) সাময়িকীতে এ সংক্রান্ত গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়েছে।

নাকের গড়ন একেক মানুষের একেক রকম, এমনকি বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর মানুষের মধ্যেও বৈচিত্র্যপূর্ণ নাক দেখা যায়। গোষ্ঠীভেদেও নাকের গড়ন আলাদা হতে পারে। যেমন: পশ্চিম আফ্রিকা, দক্ষিণ এশিয়া এবং পূর্ণ এশিয়ার নৃগোষ্ঠীর মানুষের নাসিকাপত্র ইউরোপীয় রক্তের মানুষের চেয়ে বড় হয়। পেন স্টেট ইউনিভার্সিটির নৃতত্ত্বের অধ্যাপক ও প্রধান গবেষক মার্ক ডি শ্রিভার বলেন, এর মাধ্যমে সহজেই বুঝা যায়, অতীতে এবং বর্তমানে অনেকেই যেমনটি ভাবেন- মানবজাতি বৈচিত্র্যময় এবং বহুবছর যাবত তারা পৃথম গোষ্ঠী হিসেবে বসবাস করে এসেছে।

তবে তিনি একথাও বলেন যে, মানুষ বিভিন্ন সময় পরস্পর থেকে আলাদা হয়ে গেছে আবার একত্রিত হয়েছে এই প্রক্রিয়া নিরবচ্ছিন্নভাবে চলেছে। ফলে মানুষের আলাদা কোনো একক উৎস আছে বলে মনে হয় না।
বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে জিনগত পার্থক্যগুলো খুব বেশি নয়। শ্রিভার বলেন, উদাহরণ হিসেবে যদি নাকের কথা বলি তাহলে মানুষের বহির্গঠনের ভিন্নতা জিনগত ভিন্নতার চেয়ে অনেক বেশি এবং দৃষ্টিগ্রাহ্য।

তাহলে প্রশ্ন হলো নাকের গড়নে এতো পার্থক্য তৈরি হলো কীভাবে?
শ্রিভার বলেন, এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই তারা ১০ হাজার মানুষের তথ্যভাণ্ডার থেকে ২ হাজার ৬৩৭ জনকে বেছে নেন।

তারা বেছে নিয়েছেন, উত্তর ইউরোপ, দক্ষিণ এশিয়া, পূর্ব এশিয়া এবং পশ্চিম আফ্রিকার মানুষ। এই নমুনার মানুষের নাকের বিস্তারিত ত্রিমাত্রিক ছবি নিয়ে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন তারা। নাসারন্ধ্রের প্রস্থ্য, নাসারন্ধ্রের মধ্যবর্তী দূরত্ব, নাকের উচ্চতা, নাসিকা চূড়ার দৈর্ঘ্য, নাকের বিস্তার, নাকের বহিঃস্থ অংশ এবং নাসারেন্ধ্রর ক্ষেত্রফল পরিমাপ করে তুলনা করা হয়েছে।

তথ্য উপাত্তের জটিল বিশ্লেষণের মাধ্যমে গবেষকরা সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, নাসারন্ধ্রের প্রস্থ্য এবং নাকের ভিত্তির পরিমাপ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে ভিন্ন হয়। কিন্তু তাদের মধ্যে ততোটা জিনগত পার্থক্য দেখা যায় না।
তারা বলছেন, এই বৈচিত্রের ক্ষেত্রে জিন যদি কোনো ভূমিকা না রেখে থাকে তাহলে এর পেছনে নিশ্চিতভাবে প্রাকৃতিক নির্বাচনের ভূমিকা রয়েছে। অর্থাৎ প্রকৃতির সাথে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে অঙ্গপ্রত্যঙ্গের পরিবর্তন সাধিত হয়েছে।

দেখা গেছে, নাকের গড়নের পার্থক্যের সাথে আবহাওয়া ও জলবায়ুর পার্থক্যের সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষ করে স্থানীয় তাপমাত্রা এবং আর্দ্রতার সাথে গড়নে বৈচিত্র্য দেখা গেছে।।

নাক এবং নাসিকা গহ্বর হলো এয়ার কন্ডিশনারের মতো। আঠারোশ এর শেষ দিকে ব্রিটিশ শারীরবিদ ও নৃতাত্ত্বি আর্থার থমসন দেখেছিলেন, লম্বা ও পাতলা নাক দেখা যায় শুষ্ক ও ঠান্ডা এলাকায়। আর ভোঁতা বা ছোট এবং প্রশস্ত নাক হয় গরম ও আর্দ্র অঞ্চলের মানুষের। সরু নাসিকারন্ধ্র নাকে প্রবেশকৃত বায়ুর তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা বাড়িয়ে দিতে পারে। আর এটি ঠান্ডা ও শুষ্ক আবহাওয়ার মানুষের জন্য খুব জরুরি। তাছাড়া চিকন নাকের মানুষেরা ভোঁতা নাকের মানুষের চেয়ে বেশি উর্বর!

বিশ্বব্যাপী জলবায়ুর যে নতুনধারা বিন্যাস সৃষ্টি হবে, সেই পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ-খাওয়াতে সময়োপযোগী পদক্ষেপ অত্যাবশ্যকীয়। মানব বাসের এ পৃথিবীতে যাতে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে না আসে সেজন্য বিশ্বসংস্থাসহ প্রত্যেকটি দেশ সমস্যা মোকাবিলায় এগিয়ে আসবে প্রত্যাশা এটাই।

সূত্র: বণিক বার্তা/ সিএনএন অবলম্বনে

 

 

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here