জীবনের সফলতা খোঁজেন ইংরেজি বর্ণমালায়

ধারণা করা হয়, ইংরেজি বর্ণমালাকে এ ধরনের কাজে ব্যবহারের বিষয়টি এসেছে ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত কথাবার্তা থেকে।

গত কয়েক বছর ধরে ভারতীয়দের মধ্যে এক ধরনের অদ্ভূত প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। একটা সময় জীবন সম্পর্কিত কোনো উপদেশের জন্য ধর্মগুরু কিংবা জ্যোতিষীর শরণাপন্ন হতো তারা। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এসে জীবন সম্পর্কিত উপদেশ বা ভবিষ্যদ্বাণী খুঁজতে ভারতের মধ্যবিত্ত শ্রেণি ব্যবহার করছে ইংরেজি বর্ণমালা।

দেশটিতে বর্তমানে ভাষার সংখ্যা বিশের অধিক। তবে এসব ভাষার মধ্যে শুধু শ্রদ্ধার চোখে দেখা হয় ইংরেজিকেই। মনে করা হয়, এর প্রতিটি অক্ষরই জীবন সম্পর্কিত কোনো না কোনো দিক নির্দেশনা দেয়। ধারণা করা হয়, ইংরেজি বর্ণমালাকে এ ধরনের কাজে ব্যবহারের বিষয়টি এসেছে ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত কথাবার্তা থেকে। এ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের এক রেস্তোরাঁ ব্যবস্থাপক বলেন কয়েক বছর আগে রেস্তোরাঁ ব্যবসা সংক্রান্ত থ্রি এ (তিনটি A) শিখেছি আমি। এগুলো দিয়ে বোঝানো হয়, অ্যাকনলেজ (স্বীকার করা), অ্যাপলোজাইজ (ক্ষমা করা) এবং অ্যাক্ট (কাজ করা)।’

ইংরেজি বর্ণমালা ব্যবহারের এই ব্যাপারটি এখন ভারতের প্রায় সব মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে।
ইংরেজি বর্ণমালা ব্যবহারের এই ব্যাপারটি এখন ভারতের প্রায় সব মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে।

ইংরেজি বর্ণমালা ব্যবহারের এই ব্যাপারটি এখন ভারতের প্রায় সব মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। রাস্তায় ঘুমানো মানুষ থেকে শুরু করে রাজনীতিবিদ পর্যন্ত- সবারই একটি পছন্দের বর্ণ আছে। বর্ণটিকে আদ্যক্ষর হিসেবে ব্যবহার করে তিনটি শব্দ তৈরি করেন তারা।

শব্দ তৈরির ব্যাপারটি সম্পূর্ণ স্বাধীন। A থেকে Z পর্যন্ত অক্ষরগুলোর কোনো একটি দিয়ে নিজের মতো করেই বানিয়ে নেয়া যায় শব্দগুলো। কখনো কখনো তিনের বেশিও হতে পারে শব্দ। হতে পারে পাঁচ কিংবা সাত। তবে ন্যূনতম তিনটি হতেই হবে। বিশ্বাস করা হয়, একবার যদি এভাবে মেলানো যায়, তবে জীবন হবে সহজ।

সম্প্রতি ব্যায়ামের যন্ত্রপাতি বিক্রির একটি দোকানে গিয়ে ‘এক্সারসাইকেল’ (ব্যায়ামের কাজে ব্যবহৃত বিশেষ বাইক) ক্রয় সম্পর্কে দোকানীকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল। দোকানের কাউন্টারের সামনে টি-শার্ট পরে বসেছিলেন বিক্রেতা। তাকে বলা হলো: ‘আমি দেখতে পাচ্ছি, আপনি এখানে বসে নিজের বডি-বিল্ডিং করছেন।’

তিনি বললেন, ‘কেন নয়। একজন মিষ্টি বিক্রেতা যদি নিজের দোকানে বসে দোকানের মিষ্টি খেতে পারে, তবে আমি কেন নিজের ব্যায়ামের সরঞ্জাম বিক্রির দোকানে বসে শরীরচর্চা করতে পারবো না।’ এরপরই সে নিজের জীবনের সফলতার তিনটি মন্ত্র বলতে শুরু করল: ‘ফুড, ফ্যাশন এবং ফিটনেস’।

তিনটি এফ (F) দিয়ে তিনি জীবনের সফলতা বর্ণনা করলেন। এর মধ্যে দুটি ‘এফ’ ছিল দৃশ্যমান। ‘ফিটনেস’ ব্যায়ামের সরঞ্জাম বিক্রির দোকান ছিল তার। এর নিচের তলায় ছিল ওই দোকানীর ফ্যাশনের দোকান। মানে দ্বিতীয় ‘এফ’। তবে তৃতীয় ‘এফ’ দেখা যাচ্ছিল না। তিনি জানান, একটি খাবারের দোকান করার জন্য বর্তমানে চেষ্টা করে যাচ্ছেন তিনি। দক্ষিণ ভারতীয়, চাইনিজ এবং মোগলাই খাবারের একটি দোকান এখন তার প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। এটা হলেই জীবন সফল।

ভারতীয়দের ইংরেজি বর্ণমালার অদ্ভূত ব্যবহার এখানেই শেষ নয়।
ভারতীয়দের ইংরেজি বর্ণমালার অদ্ভূত ব্যবহার এখানেই শেষ নয়।

ভারতীয়দের ইংরেজি বর্ণমালার অদ্ভূত ব্যবহার এখানেই শেষ নয়। দেশটির প্রায় প্রত্যেক লেখক এবং আলোচিত ব্যক্তি তাদের বক্তব্য ও লেখায় একই ধরনের কথাবার্তা ব্যবহার করেন। সেদিক থেকে চিন্তা করা হলে প্রথমেই বলা যায় ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নাম। দুই বছর আগে জাতীয় উন্নয়নের সূত্র হিসেবে তিনটি ‘ডি’ (D) এর কথা বর্ণনা করেন তিনি: ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড, ডেমোক্রেসি এবং ডিমান্ড ফর গুডস অ্যান্ড সার্ভিসেস’।

এর পরপরই ভারতীয় সংসদের উচ্চ ও নিম্নকক্ষে বক্তব্য দিতে গিয়ে দেশটির রাষ্ট্রপতি প্রণব ‍মুখার্জিও তিনটি ‘ডি’র গুরুত্ব সম্পর্কে বলেন: ‘ডেমোক্রেসি, ডেমোগ্রাফি ও ডিমান্ড’। এছাড়া আরো পাঁচটি ‘টি’ (T) এর কথাও বলেন তিনি: ‘ট্রাডিশন, টেলেন্ট, টুরিজম, ট্রেড অ্যান্ড টেকনোলজি’।

ভারতীয় তারকারাও নিয়মিত তাদের ফেসবুকে জীবনের সফলতার জন্য এই বর্ণমালা মন্ত্র শেয়ার করেন। সম্প্রতি হলিউড তারকা ভিন ডিজেলের সঙ্গে বলিউড তারকা দীপিকা পাড়ুকোনকে দেখা গেছে ‘দ্য রিটার্ন অব জান্ডার কেজ’ মুভিতে। তিনি তার ভক্তদের উদ্দেশে দেয়া এক পোস্টে বলেন, ‘আমি যখন বেড়ে উঠছিলাম, আমার বাবা বলেছিলেন- সেরা হতে জীবনে তিনটি ডি (D) মনে রাখবে: ডিসিপ্লিন (শৃঙ্খলা), ডেডিকেশন (ত্যাগ) এবং ডিটারমিনেশন (দৃঢ়তা)।’ এতে মোট লাইক পড়ে ১ লাখ ৪২ হাজার।

সেরা হতে জীবনে তিনটি ডি (D) মনে রাখবে:
সেরা হতে জীবনে তিনটি ডি (D) মনে রাখবে:

ভারতের বর্তমান সময়ের শীর্ষস্থানীয় লেখক চেতন ভগত সম্প্রতি দেশটির একটি জাতীয় পত্রিকায় রূপি নিষেধাজ্ঞা নিয়ে একটি উপসম্পাদকীয় লিখেন, যার শিরোনাম ছিল: ‘ভারতের রাজনীতিতে নতুন তিনটি ‘আই’ (I)’। তিনটি আই দিয়ে তিনি ‘ইনটেনশন’ (ইচ্ছা), ‘ইনিশিয়েটিভ’ (উদ্যোগ) এবং ‘আইডিয়া’ (ধারণা) বুঝিয়েছেন।

এমনকী একাজে পিছিয়ে নেই ভারতীয় ধর্মগুরুরাও। শ্রী শ্রী রবিশঙ্কর তার এক টুইটার পোস্টে তিনটি ‘পি’ (P) এর কথা বলেছেন: ‘প্রিজারভেন্স’ (অধ্যবসায়), পেশেন্স (ধৈর্য) এবং ‘পবিসিলিটি’ (সম্ভাবনা)।

ভারতে এমন অদ্ভূত বর্ণমালার ব্যবহার নিয়ে বিতর্কে জড়িয়েছেন দেশটির ব্যাকরণবিদরা। নির্দিষ্ট বর্ণের পরে যে ‘এস’ বর্ণটি থাকে (যেমন: Ts, অর্থাৎ টিগুলো। একাধিক T বুঝানোর জন্য ব্যবহৃত হয় এটি) এর মাঝামাঝি অ্যাপস্ট্রফি (‘) ব্যবহার করা হবে কি না, তা নিয়ে।

এ প্রথাটি কে উদ্ভাবন করল, তা নিয়েও আছে বিতর্ক। স্বাভাবিকভাবে কোনো জিনিস প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলে সবাই চায় নিজেকে তার অগ্রদূত প্রমাণ করতে।

এ বিষয়ে দিল্লির সেন্ট স্টিফেন কলেজের ইতিহাস বিভাগের প্রভাষক নায়না দয়াল লিখেছেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের একটি অনুষ্ঠানে আমি যোগ দিয়েছিলাম। সেই অনুষ্ঠানে সাবেক এক গভর্নর ১৪টি সি (C) সম্পর্কে বলেন, যা শিক্ষার্থীদের ওপর প্রয়োগ করা প্রয়োজন। এগুলো ছিল: confidence, courage, credibility, capability, compassion, concentration, creativity, co-ordination, communication, competence, co-relation, character, culture and commitment.’

এর আগে কেউ ভারতে বর্ণমালার এ ধরনের ব্যবহার করেনি বলে জানান তিনি। সারা দেশে অবশ্য একটি বর্ণ দিয়ে তিনটি শব্দ তৈরি করা হয়। কিন্তু নায়না দয়াল ১৪টির কথা বললেন।

এ নিয়ে অনেকে বলেন, সব বর্ণই সমান। তাই কোনো কিছুতে কোনো বিশেষ বর্ণকে আলাদা করে জোর দেয়ার কোনো মানে হয় না। সম্প্রতি একজন লেখক লিখেছেন, তারা আমার পরিবারের সদস্যদের মতো। কোনো বর্ণকে বেশি গুরুত্ব দেয়া অন্যায্য।

সূত্র: বিবিসি / বণিকবার্তা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here