শিশুকে ফার্মের মুরগি বলা কেন?

শিশু

এখনকার শিশু সম্পর্কে আমি প্রায়ই একটা কথা শুনি; এরা নাকি ফার্মের মুরগি! অবস্থাপন্ন বাবা-মায়েরা অতি আহ্লাদে সন্তান মানুষ করেন বলেই নাকি এরা এমন ভঙ্গুর মানুষ হয়ে বড় হয়। অর্থাৎ কিনা এদের মধ্যে সহনশীলতা বড্ড কম থাকে। অতি মাত্রায় স্পর্শকাতর। বায়নাবাজও বটে! শিশুদের সম্পর্কে এমন মন্তব্য সত্যি বেদনাদায়ক।

একটা শিশুকে জন্ম থেকে ৫ বছর বয়স পর্যন্ত ঠিক যে আদলে তৈরি করা হবে সে তেমনটিই তৈরি হবে। বাবা-মা সন্তানকে নিশ্চয়ই আদর-সোহাগ দেবেন। এর প্রয়োজন আছে। ভালোবাসার প্রাপ্তি প্রতিটি শিশুর অধিকার। এর অভাব শিশুর স্বাভাবিক বিকাশের পথে অন্তরায়। এ না হলে একটা শিশুর ভেতরে আবেগিক বিকাশ ঠিক মতো হয় না। তাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাসের অভাব দেখা যায়। ভালোবাসার অভাব তাদের মধ্যে ক্ষোভের জন্ম দেয়। মানুষের প্রতি আস্থা নষ্ট করে। এরা তখন হতাশায় ভোগে। কাজেই শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশের ক্ষেত্রে আদর-সোহাগ বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাই পালন করে।

এখন একটা শিশুকে যদি মাত্রা চেতনা বজায় না রেখে ভালোবাসা হয়! তবে? তাহলে শিশুদের মধ্যে তৈরি হবে অন্য ধরনের আচরণীয় সমস্যা। কোনও বাবা-মা যদি সন্তানের সমস্ত আবদার পূরণে ব্যতি ব্যস্ত থাকেন তাহলে সন্তান একটা সময়ে তাদের অক্ষমতার বিষয়টি মানতে চাইবে না। যদি অকারণ প্রশংসায় পঞ্চমুখ থাকেন তবে সে সামাজিক সমালোচনা নিতে শিখবে না। যদি সন্তানের সামান্য সাফল্যে আবেগে ভেসে যান তবে কষ্ট করে নিজেকে আরও শাণিত করার শক্তি সে হারাবে। কাজেই মাত্রা চেতনা থাকা চাই।

আমার নিজের একটা ফিল্ড স্টাডিতে যেখানে ৩ থেকে ৪ বছর বয়সের মায়েদের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম সেখানে জানতে পেরেছিলাম ৪ বছরের একটা শিশু সন্তান মায়ের কাছ থেকে খুচরো টাকা নিয়ে ঘরের সামনে দোকান থেকে এটা সেটা কিনে খায়! এ তথ্য জানার পর আমার প্রথম বিস্ময় ছিল, একটা শিশুর হাতে অর্থ দেওয়া কেন? মায়ের সঙ্গে কথা বলে জানা গেলো তিনি চাকরি করেন। সন্তান একা বাসায় ভৃত্যের তত্ত্বাবধানে থাকে। কাজেই সন্তানকে শান্ত রাখতে এই আবদার তাকে মানতে হয় কারণ তিনি সময়ে সন্তানের আবদার পূরণ করতে অক্ষম।

আসলে সমস্যা তৈরি হয় যখন বাবা-মা সন্তানের বিকাশ সম্পর্কে ধারণা রাখেন না। এক্ষেত্রে চাকরিজীবী বা গৃহিণী মা উভয়ের কথাই আসতে পারে। এমন ভাবার কোনও কারণ নেই যে মা চাকরি করেন না বলেই শিশু বিকাশ সম্পর্কে জানেন না! কারণ বহু চাকরিজীবী মা আছেন যারা শিশু বিকাশ সম্পর্কে জানেন না। কাজেই যারা শিশু বিকাশ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নন তারা দেখা যায় ভালোবাসার যথাযথ বহিঃপ্রকাশ সম্পর্কে ধারণা রাখেন না। অবহেলা করে বা সাংসারিক চাপে বা চাকরির প্রেশারে পরে এটা সেটা দিয়ে সন্তানকে শান্ত রাখতে চান। তখন দেখা যায় না বুঝে ভালোবাসার প্রকাশ হিসেবে এমন কিছু করে বসেন যা সন্তানের বিকাশের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়।

আসলে সন্তান চায় সময়। যিনি গৃহিণী মা তিনি তার কাজের সঙ্গে সামঞ্জস্যতা বজায় রেখেই সন্তানের বিকাশের দিকগুলো নিয়ে ভাববেন। যেমন তাকে নিয়ে আঁকতে বসা। কথা বলা, গল্প করা। মা যদি বাসায় থাকেন তবে শিশুকে সময় দিতে পারেন কাজ করতে করতেই। রাঁধতে রাঁধতে আঁকাতে পারেন। গোসল করাতে করাতে গান গাইতে পারেন। বিকেলে খেলতে পারেন। রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে গল্প শোনাতে পারেন। আবার যিনি চাকরিজীবী মা তিনি সন্ধ্যার পর বাড়ি ফিরে আরাম করতে করতেই গল্প শোনাতে পারেন, শুনতে পারেন। রাতের খাবার দিতে দিতেই আঁকাতে পারেন। ঘুমাতে যাওয়ার আগে ব্লক বা এই জাতীয় বুদ্ধিবৃত্তিক খেলা খেলতে পারেন কিছুটা সময়। সময় দেওয়াটা মুশকিল কিন্তু অসম্ভব কিন্তু না। শিশুর বয়স বুঝেই বিকাশের দিকগুলো ভেবে শিশুকে সময় দেওয়া চাই। তবে সন্তানকে সময় দিতে পারছেন না এই অপরাধবোধে ভুগে যদি অকারণ ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটান তবে নিজের অজান্তেই শিশুর স্বাভাবিক বেড়ে ওঠার পথটা নষ্ট করবেন। এক্ষেত্রে সমাজ বদনাম করবে শিশুকেই। যেখানে শিশুদের সত্যি কোন হাত নেই!

4

একটা শিশুকে ‘ফার্মের মুরগি’ বলে সম্বোধন এক  প্রকার অশ্লীল গালাগাল ছাড়া আর কিছুই নয়!

আসলে শিশু লালনের ক্ষেত্রে শিশু বিকাশ সম্পর্কিত জ্ঞানকে অবহেলা করা যায় না মোটেই! এ জ্ঞান বাবা-মাকে সন্তান লালনের ক্ষেত্রে পরিমিতবোধ সম্পর্কেই শিক্ষা দেয়। শেখায় শিশুর শারীরিক, মানসিক, আবেগিক, ভাষাগত ও বুদ্ধিবৃত্তিক দিকগুলো বিবেচনায় রেখে কিভাবে সন্তানকে আগামীর জন্য তৈরি করা যায়। একটা শিশুকে কেমন ভালোবাসা দিতে হবে। কিভাবে দিতে হবে সে শিক্ষাও দেয়। একটা নবজাতক শিশুকে আদর করে যখন বাবা-মা শিশুর হাতটি ধরেন শিশু সে ভালোবাসা অনুভব করতে পারে। একটা ছয় মাস বয়সী শিশুকে আদর করে বাবা যখন নাকের সাথে নাক ঘষে দেন তখক শিশুটি হেসে ওঠে। এ সবইতো ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু ওই যে যখন শিশুকে অতি আহ্লাদ করে বাস্তব অবস্থা থেকে দূরে সরিয়ে রাখেন তখন শিশুর ভেতরকার যাবতীয় সম্ভাবনাগুলো নষ্ট হয়ে যায়। তবে আর যাই হোক একটা শিশুকে ‘ফার্মের মুরগি’ বলে সম্বোধন এক  প্রকার অশ্লীল গালাগাল ছাড়া আর কিছুই নয়! যারা আমাদের জন্য ভবিষ্যতের মশাল বহন করবে তাদের সম্পর্কেতো নয়ই। কাজেই চলুন নিজের স্বার্থে, সন্তানের স্বার্থে শিশু বিকাশের দিকগুলো নিয়ে ভাবি, জানি। সচেতন হয়েই একজন সচেতন নাগরিক তৈরি করি।

লেখক: ফারহানা মান্নান, শিক্ষা বিষয়ক গবেষক।

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here