সব সেবা মিলবে স্মার্টকার্ডে

সব ধরনের নাগরিক সুবিধা ও সেবা নিশ্চিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে স্মার্টকার্ড। প্রয়োজনীয় নাগরিক সুবিধার ক্ষেত্রে এটির ব্যবহারও বাধ্যতামূলক। ব্যক্তির পরিচিতি ও তার তথ্য যাচাইয়েও অপরিহার্য এই স্মার্টকার্ড। এনআইডি ও ইসি কর্মকর্তারা বলছেন, রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যবহারের পাশাপাশি দেশের বাইরেও স্মার্টকার্ডের ব্যবহার উপযোগী হবে এটি। যা লেমিনেটিং করা পরিচয়পত্রের মাধ্যমে সম্ভব হতো না। জাতীয় পরিচয়পত্র নিবন্ধন অনুবিভাগের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুজ্জামান মোঃ সালেহ উদ্দিন জানান, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এখন ই-গেটিং পদ্ধতি চালু রয়েছে। সেসব দেশে আমাদের এই স্মার্টকার্ড ব্যবহার করা যাবে। তার মতে, সার্কভুক্ত দেশে ভবিষ্যতে ভিসা পদ্ধতি তুলে দিয়ে ই-গেটিং পদ্ধতি চালু করলে সেখানেও ব্যবহারের জন্য এই স্মার্টকার্ড উপযোগী।

প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ভবিষ্যতের চাহিদার কথা মাথায় রেখেই নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে স্মার্টকার্ড তৈরি করা হয়েছে। যা আগামী অক্টোবর মাস থেকেই নাগরিকদের হাতে পৌঁছে দেয়া হবে। তারা জানান, উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর ২৫ নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য সংবলিত এই স্মার্টকার্ডে ভোটারদের সব তথ্য সংরক্ষিত থাকবে। ফলে কারো পক্ষে টু-ডি বারকোডযুক্ত যন্ত্রে পাঠযোগ্য এই কার্ড সহজে নকল করা সম্ভব হবে না।

তারা বলছেন, তথ্য যাচাইয়ে স্মার্টকার্ড অনলাইন ও অফলাইন দু’ভাবেই ব্যবহার করা যাবে। তথ্য যাচাইয়ের জন্য বর্তমানে কিছু প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) চুক্তি রয়েছে? এ জন্য ইসি থেকে একটি ফ্রি সফটওয়্যার সরবরাহ করা হবে। ওই সফটওয়্যারের মাধ্যমে যে কেউ ভোটারদের তথ্য যাচাই করতে পারবেন। একজন চাকরি প্রার্থীর ক্ষেত্রে চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠানও সহজেই তার তথ্য যাচাই করে দেখতে পারে স্মার্টকার্ডের মাধ্যমে। এক্ষেত্রে তারা বায়োডাটার সঙ্গে দেয়া তথ্য মিলিয়ে নিশ্চিত হতে পারবেন।

এছাড়াও ড্রাইভিং লাইসেন্স থেকে শুরু করে টিআইএন, পাসপোর্ট, চাকরির আবেদন, সম্পত্তি কেনাবেচা, বিয়ে রেজিস্ট্রেশন, ব্যাংকে এ্যাকাউন্ট খোলা ও ব্যাংক ঋণ, বিও এ্যাকাউন্ট, সরকারী বিভিন্ন ভাতা উত্তোলন, সরকারী কর্মচারীদের বেতন ও অবসরপ্রাপ্তদের পেনশন উত্তোলন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি, বিমানবন্দরে আগমন ও বহির্গমন, বিমা স্কিম, গ্যাস-বিদ্যুত সংযোগ, বিভিন্ন ধরনের ই-টিকেটিং, মোবাইল সংযোগ, হেল্থ কার্ড, ই-ক্যাশসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় কাজে স্মার্টকার্ডের ব্যবহার বাধ্যতামূলক হবে।

ইসি ও এনআইডি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, স্মার্টকার্ড দেখতে অনেকটা ব্যাংকের এটিএম কার্ডের অনুরূপ। যার উভয় পাশে বিভিন্ন তথ্য সন্নিবেশিত থাকবে। এক পাশে ভোটারের নাম, পিতা-মাতার নাম, জন্ম তারিখ, এনআইডি নম্বর, স্বাক্ষর এবং অপর পিঠে ঠিকানা, ব্লাড গ্রুপ এবং ইস্যুর তারিখ দেয়া থাকবে। এছাড়া থাকবে ছবি, মেমোরি চিপ, বারকোডসহ বিভিন্ন নিরাপত্তা ফিচার। ফলে এটি কারো পক্ষে জালিয়াতির করাও সম্ভব হবে না।

এছাড়াও স্মার্টকার্ডে প্রয়োজনীয় সব তথ্য যুক্ত করার পরও অন্তত ৬০ কিলোবাইট ব্যবহার উপযোগী মেমোরি থাকবে। পরে ওই স্পেস বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা যাবে। কার্ডের নিরাপত্তায় এপিঠ-ওপিঠে চারটি ছবি থাকবে। স্মার্টকার্ডের সুযোগসুবিধা প্রচারের জন্যও জাতীয় ক্রিকেট দলের অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজাকে ব্র্যান্ড এ্যাম্বাসেডর করা হয়েছে বলে তারা জানান।

তবে তারা উল্লেখ করেন, ভোটারদের হাতে থাকা লেমিনেটেড জাতীয় পরিচয়পত্রে রঙিন ছবি থাকলেও ‘উন্নতমানের’ স্মার্টকার্ডে থাকছে সাদা-কালো ছবির ব্যবহার। ‘আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে’ কার্ডে দৃশ্যমান ছবি সাদা-কালোই হবে। তবে কার্ডে যুক্ত মেমোরি চিপে রঙিন ছবি থাকবে। এই কার্ডের মেয়াদ হবে ১০ বছর। নির্বাচন কমিশন সচিব সিরাজুল ইসলাম জানিয়েছেন, ইউনিক পরিচিতি নম্বর, হলোগ্রামযুক্ত, মেমোরি চিপ ও বারকোডসহ আন্তর্জাতিক মানের এ জাতীয় পরিচয়পত্রে নাগরিকের সাদা-কালো ছবি থাকবে। কারিগরি ও অন্যান্য সুবিধার কথা মাথায় রেখে ভোটারের রঙিন ছবি ব্যবহার সম্ভব হচ্ছে না। এতে পলিকার্বনেটেড কার্ড ব্যবহার করা হচ্ছে বলেই ছবি সাদা-কালো হবে উল্লেখ করেন।

জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুজ্জামান মোঃ সালেহ উদ্দিন বলেন, পলিকার্বনেট লেজার দিয়ে পোড়ানো হয় বলে ছবি সাদা-কালোই হয়। এতে ছবির রেজুলেশন ভাল থাকে। উজ্জ্বল দেখায়। সারা পৃথিবীতেই এ ধরনের কার্ডে সাদা-কালো ছবি থাকে। তবে মেমোরি চিপে ভোটারের রঙিন ছবি সংরক্ষিত থাকছে। তিনি জানান, শতভাগ পলিকার্বনেটে তৈরি এই কার্ড মেশিন রিডেবল। যাতে নাগরিকের প্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত তথ্য সংরক্ষিত থাকবে। তথ্যের কিছু হবে দৃশ্যমান। কিছু বায়োমেট্রিক। হলোগ্রামযুক্ত কার্ডে থাকবে দ্বিমাত্রিক বারকোড। আর্দ্রতা, রাসায়নিক ও ইলেক্ট্রো ম্যাগনেটিক ফিল্ড প্রতিরোধী হবে এই কার্ড।

ইসি সূত্র মতে, ইতোমধ্যে স্মার্টকার্ড নাগরিকদের হাতে পৌঁছে দেয়ার জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি তারা সম্পন্ন করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধনের পরই এটা বিতরণ শুরু হবে। ৩ অক্টোবর থেকে রাজধানী ঢাকা ও কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার একটি চর এলাকায় এটি বিতরণ শুরু হবে। তবে পর্যায়ক্রমে সব নাগরিকের হাতে ২০১৭ সালে ডিসেম্বর নাগাদ পৌঁছে দেয়া হবে। তারা জানান, স্মার্টকার্ড বিতরণের সময় ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশনসহ সব এলাকায় ক্যাম্প করা হবে। যাদের হাতে লেমিনেটিং করা জাতীয় পরিচিয়পত্র রয়েছে তারা সশরীরে ক্যাম্পে এসে স্মার্টকার্ড সংগ্রহ করবেন। এটি সংগ্রহ করার সময় তার কাছে থাকা আগের কার্ড অবশ্যই ফেরত দিতে হবে। লেমিনেটিং করা পরিচয়পত্র কাছে না থাকলে বা হারিয়ে গেলে সেক্ষেত্রে স্মার্টকার্ড প্রদান করা হবে না। এক্ষেত্রে কারো কার্ড হারিয়ে গিয়ে থাকলে নির্ধারিত ফি পরিশোধের মাধ্যমে যে কেউ তাৎক্ষণিকভাবে কার্ড সংগ্রহ করে নিতে পারবেন। এছাড়া স্মার্টকার্ড দেয়ার সময় জাতীয় পরিচয়পত্রধারীদের আরও কিছু তথ্য প্রদান করতে হবে। এক্ষেত্রে আগে প্রদান করা দুটি আঙ্গুলের ছাপের পরিবর্তে এবার তার ১০ আঙ্গুলেরই ছাপ দিতে হবে। এছাড়াও চোখের মণির প্রতিচ্ছবি দিতে হবে। ইসি কর্মকর্তারা জানান, মূলত একজন নাগরিকের তথ্যভান্ডার সমৃদ্ধ করতেই এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here