হলুদের রাজ্যে একদিন

হলুদের রাজ্যে একদিন

বৈচিত্র্যময় লোকসংস্কৃতি আর প্রত্নতত্ত্ব বিষয় দুটি আমার খুব প্রিয়। ঢাকার আশপাশে একটু নিরিবিলি পরিবেশে দেশীয় সংস্কৃতি আর পুরনোর সমারোহ দেখতে হলে সবচেয়ে সঠিক গন্তব্য হচ্ছে সোনারগাঁ। আমার এ ভ্রমণ যখন ঠিক, তখনই সোনারগাঁয়ে চলছিল মাসব্যাপী লোকশিল্প মেলা। খবরটা জানার পর একদিন দেখতে যাব বলে মনে মনে একটি সময় বের করার চেষ্টা  করছিলাম। তখনই আশ্চর্য যোগাযোগের মতো সোনারগাঁ থেকে একজন ফেসবুক বন্ধুর টেক্সট পেলাম। সে আমাকে সোনারগাঁ বেড়াতে যাওয়ার জন্য পীড়াপীড়ি করছে! আরো খবর পেলাম, সময় পেরিয়ে গেলেও সোনারগাঁর আশপাশের গ্রামে এখনো সর্ষে ফুলের বন্যা বইছে। আমার হিসাবে এই সময়ে সাধারণত ফুল থাকার কথা নয়। সপ্তাহখানেক আগে আমার পরিচিত একজন, অপু ভাই নারায়ণগঞ্জের সর্ষে ক্ষেতের ছবি শেয়ার দিয়েছিলেন। তার ছবি দেখেই কিছুটা ভরসা পেলাম, ফুল থাকলেও থাকতে পারে। প্রতি বছর সর্ষে ফুল ফোটার সময়ে গ্রামীণ এলাকায় হাইকিংসহ ফটোওয়াক করা হলেও এ বছর নানা ব্যস্ততায় সময় কেটে গেছে। ফেসবুকে অন্যদের হলদে সমুদ্রের ছবি দেখে দেখে হতাশই হচ্ছিলাম। ঢাকার পাশেই যেহেতু সর্ষে ফুলের সন্ধান মিলেছে, তাই হাতছাড়া করতে মন চাইল না। সাতজনের একটি দল নিয়ে রওনা হলাম সোনারগাঁর উদ্দেশ্যে। এর আগেই যথাসময়ে সবাই উপস্থিত হয়েছি গুলিস্তান মওলানা ভাসানী হকি স্টেডিয়াম-সংলগ্ন বোরাক কাউন্টারে। বোরাক পরিবহনের নতুন এসি বাস ফাঁকা রাস্তায় দ্রুত চলতে লাগল। মাত্র ৪০ মিনিটেই পৌঁছে গেল আমাদের গন্তব্য মগড়া পাড়া বাসস্টপে।

চারদিকে কি হলদে রঙের বাহার। যেন হলুদ কোনো মহাসমুদ্রের তীরে এসে দাঁড়িয়েছি আমরা।
চারদিকে কি হলদে রঙের বাহার। যেন হলুদ কোনো মহাসমুদ্রের তীরে এসে দাঁড়িয়েছি আমরা।

সেখান থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশা নিয়ে বামদিকে ২৫-৩০ মিনিটের পথ পেরিয়ে আমরা পৌঁছে গেলাম বাঘার পাড়া গ্রামে। আহা! তক্ষুনি চোখের সামনে খুলে গেল অপূর্ব এক রূপের আধার— চারদিকে কি হলদে রঙের বাহার। যেন হলুদ কোনো মহাসমুদ্রের তীরে এসে দাঁড়িয়েছি আমরা।

মেঠো পথ ধরে যতই এগিয়ে চলেছি, ততই যেন অভিভূত হচ্ছি। সবাই ব্যস্ত ফটোগ্রাফি আর আনন্দ অবগাহনে। কীভাবে যে সময় কেটে গেল বুঝতেই পারলাম না। এদিকে পেটে তখন রাজ্যের ক্ষুধা। বারদী বাজারের একটা হোটেলেই খাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। স্থানীয় নদীর মাছ দিয়ে ভাত যেন অমৃতসমান। সদ্য ভাজা মচমচে জিলাপিও চেখে দেখলাম। এদিকে বিকাল গড়িয়ে গেছে। তাই লোকশিল্প মেলা এই যাত্রায় বাদ দিলাম। মেলা তো মধ্য ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলবে। এর আগেই আরেকবার আসা হবে নিশ্চয়ই। তাই নিজের পরিকল্পনামতো ভ্রমণ না চললেও ক্ষতি নেই। গন্তব্যই যখন ভ্রমণে নেতৃত্ব দেয়, তখনই সেটা হয়ে ওঠে প্রকৃত ভ্রমণ।

শেষ বিকালে কোথায় যাওয়া যায়?

নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁ উপজেলার বারদী ইউনিয়ন পরিষদ সংলগ্ন শ্রী শ্রী লোকনাথ ব্রহ্মচারীর আশ্রম অবস্থিত। লোকনাথ ব্রহ্মচারী এটি তৈরী করেছিলেন। সিদ্ধান্ত হলো কাছাকাছি বারদী লোকনাথ ব্রহ্মচারী আশ্রম আর মন্দির পরিদর্শনের। ভক্তদের আনাগোনায় মুখরিত লোকনাথ আশ্রম কিন্তু অবাঞ্ছিত চেঁচামেচি নেই।

পুকুরের মাঝখানে নির্মিত শিবমূর্তি যেন স্পর্শের বাইরের এক পবিত্র সত্তাকেই মনে করিয়ে দেয়;
পুকুরের মাঝখানে নির্মিত শিবমূর্তি যেন স্পর্শের বাইরের এক পবিত্র সত্তাকেই মনে করিয়ে দেয়;

পুকুরের মাঝখানে নির্মিত শিবমূর্তি যেন স্পর্শের বাইরের এক পবিত্র সত্তাকেই মনে করিয়ে দেয়; যাকে শুধুই ভক্তি, শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা দিয়ে স্পর্শ করা যায়; পাপাচারী হাত দিয়ে নয়।

শ্রী শ্রী বাবা লোকনাথ ব্রম্মচারীর আশ্রমের ঠিক দক্ষিণের উঠোনে, তাঁর সমাধিস্থলের পশ্চিমে, মূল গেটের ঠিক সামনে, পথ আগলে শত বৎসর ধরে কালের নানা ঘটনার সাক্ষী যে হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, সে হলো বিশাল আকৃতির একটি বকুল গাছ। সে আজও তেমনি করে ছায়া দেয়। দেয় অসংখ্য পাপড়িযুক্ত হালকা মাটি রঙা ছোট ছোট সুগন্ধি ফুল। আশ্রমের ভেতরে লোকনাথ ব্রহ্মচারীর বিশাল তৈলচিত্র। এখানে সকাল সন্ধ্যা পুজা হয়। মুল আশ্রমের পেছনে খোলা একটু উঠান পেরিয়েই বিশাল পাঁচতলা ভবনের যাত্রীনিবাস। পশ্চিমে আরও দুটি বিশালাকার যাত্রীনিবাস। যাত্রীদের যে কেউ থাকতে পারবে এখানে। এই জন্যে কোন অর্থ দিতে হবে না। একটু অবাক করনের বিষয়ই বটে, বর্তমান যুগে বিনে পয়সায় রাত যাপন।

শ্রী লোকনাথ ব্রহ্মচারী আশ্রম এর লোকদের কাছে শুনলাম- প্রতি বছর উনিশ জৈষ্ঠ এখানে সপ্তাহ ব্যাপী মেলা বসে। ১২৯৭ সালের এই দিনে পরমপুরুষ শ্রী শ্রী লোকনাথ ব্রম্মচারী মৃত্যুবরণ করেন। তার এই মহাকাল প্রয়াণের দিনটিকে ভক্তি শ্রদ্ধার মধ্য দিয়ে স্মরণ করার জন্যই মেলার আয়োজন হয়। আশ্রমের ঠিক সামনে বিশাল সবুজ মাঠ। এখানেই মেলা বসে। মেলাকে কেন্দ্র করে বিশাল আয়োজন করা হয় এখানে। নানান এলাকা থেকে হাজারও পন্য আসে। আসে বাহারী তৈজসপত্র, আহারের ফল ফলাদি আরও কত কি। বহুদেশের বহু ধর্মাবলম্বী মানুষের আগমন ঘটে মেলায়। এ এক বিশাল আয়োজন। এক সপ্তাহব্যাপি চলতে থাকে রাতদিন।

এখানে সকাল সন্ধ্যা পুজা হয়।
এখানে সকাল সন্ধ্যা পুজা হয়।

নাগরিক ব্যস্ততা আর ইট-কাঠের জীবন নিয়ে যখন ক্লান্ত দেহ-মন, আর ঘুম ভাঙ্গা থেকে শুরু করে ঘুমুতে যাওয়া পর্যন্ত সামগ্রিক জীবনের একঘেয়েমিতে হাঁপিয়ে উঠার আগেই ঘুরে আসতে পারেন “বারদী”, শ্রী লোকনাথ ব্রহ্মচারী আশ্রম থেকে অবশ্য মেলার সময়ও যেতে পারেন।

সন্ধ্যে গড়িয়ে রাত হতে চলল। এবার বাড়ি ফেরার পালা। তবে বলে রাখি, এই ভ্রমণে এলে যারা ছবি তুলতে ভালোবাসেন, তারা সবচেয়ে বেশি উপভোগ করবেন। প্রকৃতির নানা বৈচিত্র্য ক্যামেরায় ধারণ করাই যাদের উদ্দেশ্য। যদিও এখন সর্ষে ফুলের মৌসুম শেষ। মাঠের হলুদ ক্যানভাসে জায়গা করে নিয়েছে সবুজ মটরশুঁটি। তবে ক্যামেরাপ্রেমীদের মন খারাপের কারণ নেই। হলুদ সর্ষে ফুলের বদলে সবুজ মটরশুঁটির মুগ্ধতা নিয়ে ফেরার অভিজ্ঞতাও মন্দ নয়।

কীভাবে যেতে হবে?

গুলিস্তান মওলানা ভাসানী হকি স্টেডিয়ামের গেট থেকে বোরাক এসি, নন এসি বাস ভাড়া ৪৫-৬৫ টাকা মগড়া পাড়া পর্যন্ত। ৪০ মিনিটের পথ। লোকাল অটোরিকশা নিয়ে বাঘার পাড়া পর্যন্ত ২০ মিনিটের পথ। অটোরিকশা ভাড়া ১৫০ টাকার মতো। বারদী যাওয়ার পথে ফুলদী নামের একটা জায়গা আছে, সেখানে নেমে বাঁদিকে হাঁটলেই দেখবেন মাঠজুড়ে আগুন জ্বলছে, হলুদ আর  হলুদ। ওটাই বাঘার পাড়া গ্রাম। আশ্রমে যেতে চাইলে বারদী বাজার পর্যন্ত রিকশা ভাড়া ২০ টাকা। সেখান থেকেই অটোরিকশা পাবেন মগড়া পাড়া পর্যন্ত। ২০০ টাকার মতো নেবে। খাওয়ার জন্য খুব ভালো মানের রেস্টুরেন্ট নেই, তবে খাবার খেতে খারাপ লাগবে না।

সূত্রঃ

লেখক: ডা. ইমরুল হাসান ওয়ার্সী

অ্যাডভেঞ্চার ট্রাভেলার, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ

বণিকবার্তা

আদার ব্যাপারী ডট কম

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here