জেনে নিন স্ট্রোক’র বিস্তারিত

 

মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহকারী রক্তনালীতে বাধা সৃষ্টি হলে মস্তিস্কের কোন একটি অংশে রক্ত সরবরাহ সাময়িক বা স্থায়ী ভাবে বন্ধ হয়ে যায়, ফলে মস্তিস্কের ঐ অংশটি সাময়িক বা স্থায়ী ভাবে কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলে যাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় স্ট্রোক বলা হয়।

স্ট্রোক এর কারন, লক্ষণ ও জরুরী মুহূর্তে করনীয় সম্পর্কে আমাদের প্রত্যেকেরই ধারনা থাকা প্রয়োজন কেননা স্ট্রোক যেকোনো মানুষের যেকোনো সময় হতে পারে এবং এর ফলে পক্ষাঘাতগ্রস্থতা এমনকি মৃত্যুর সম্ভাবনাও রয়েছে। তবে স্ট্রোক এর লক্ষণ দেখা মাত্র দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহন করলে ক্ষতির পরিমান অনেকাংশেই কমিয়ে আনা সম্ভব। আসুন জেনে নিই স্ট্রোক সম্পর্কে-

স্ট্রোক এর লক্ষণগুলো কি কি?

আকস্মিকভাবে নিম্নোক্ত লক্ষণসমূহের কোনটি দেখা দিলে দেরি না করে আক্রান্ত ব্যক্তিকে নিকটস্থ হাসপাতালে স্থানান্তর করা প্রয়োজন-
# কথা বলতে অসুবিধা বোধ করা; জিহ্বা এবং মুখের পেশী অসার হয়ে যাবার কারনে এমনটি হয়।
# বুঝতে অসুবিধা বোধ করা এবং বিভ্রান্তি; এসব ক্ষেত্রে মানুষ অত্যন্ত সহজ প্রশ্নও বুঝতে পারে না অথবা উত্তর দিতে বিভ্রান্ত বোধ করে।
# শরীরের কোন পেশী শক্তিহীন বোধ করা বা কোথাও নিস্তেজ বোধ করা; সাধারনত শরীরের # যেকোনো একপাশে এ ধরনের সমস্যা হয়।
# তীব্র মাথা ব্যাথা অনুভব করা।
# এক বা উভয় চোখে দেখতে অসুবিধা বোধ করা।
# খাবার গিলতে অসুবিধা বোধ করা।
# মুখের একপাশ ঝুলে যাওয়া।

পরীক্ষা করুন দ্রুত, FAST test এর মাধ্যমেঃ
F=Face: যদি মুখের একপাশ ঝুলে পরে তবে সেটি স্ট্রোকের সম্ভাব্য লক্ষণ।
A=Arm: যদি কেও দুই হাত সমান ভাবে সামনে প্রসস্থ অবস্থায় তুলে ধরতে না পারে তবে সেটিও স্ট্রোকের একটি লক্ষণ।
S=Speech: কেও যদি স্পষ্ট ভাবে কথা বলতে না পারে, কথা যদি অস্পষ্ট বা জড়ানো হয় তবে সেটি স্ট্রোকের একটি সম্ভাব্য লক্ষণ।
T=Time: এ ধরনের লক্ষণ দেখা দিলে সময় নষ্ট না করে রোগীকে হাসপাতালে স্থানান্তর করা প্রয়োজন।

সময়ের সাথে সাথে মস্তিষ্কের ক্ষতির সম্ভাবনা বাড়েঃ
স্ট্রোক হবার পর দ্রুত রোগীকে হাসপাতালে স্থানান্তর করা সম্ভব হলে অনেক ক্ষেত্রে ওষুধ প্রয়োগের মাধ্যমে মস্তিষ্কের আক্রান্ত স্থানে রক্ত চলাচল পুনরায় চালু করা সম্ভব হয়, এতে মস্তিষ্কের ক্ষতির পরিমান হ্রাস পায়। পক্ষান্তরে যত দেরিতে রোগীকে হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়, মস্তিষ্কের ক্ষতির পরিমান ততই বাড়তে থাকে; পাশাপাশি রোগীর মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ সহ নানা জটিলতার পরিমাণও বাড়তে থাকে।
তাই স্ট্রোকের লক্ষণ দেখা দেওয়া মাত্র FAST test এর মাধ্যমে পরিক্ষা করে রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে স্থানান্তর করার ব্যাপারে পরামর্ষ দেয়া হয়।

মিনি স্ট্রোকঃ

বর্তমান সময়ে “মিনি স্ট্রোক” শব্দটি আমাদের অনেকের কাছেই পরিচিত। আসলে এর মানে কি? এর অপর নাম “ট্রান্সিয়েন্ট ইশকেমিক অ্যটাক”; এ ক্ষেত্রে রোগীর মস্তিষ্কে রক্ত চলাচল সাময়িক ভাবে বন্ধ হয় এবং পুনরায় চালু হয়ে যায়। মিনি স্ট্রোক হলে স্ট্রোক এর লক্ষণ সমূহ অল্পবিস্তর পরিলক্ষিত হয় এবং তা সেরেও যায়, তবে এটি পরবর্তী সময়ে স্ট্রোকের সম্ভাবনাকে জোরদার করে। তাই এটিকে স্ট্রোকের পূর্বাভাস হিসেবে গণ্য করে ডাক্তারের পরামর্ষ নেয়া উচিৎ।

স্ট্রোক কেন হয়?

এথেরোস্ক্লেরোসিস হলে; অর্থাৎ রক্তনালীর ভেতর দিকের দেয়ালে কোলেস্টেরল, চর্বি, ক্যালসিয়াম ইত্যাদি জমা হয়ে রক্ত চলাচলের পথ সঙ্কীর্ণ বা বন্ধ হয়ে গেলে এবং রক্তনালীর প্রসারণশীলতা কমে গেলে মস্তিষ্কের কোন একটি অংশে রক্ত সরবরাহ সাময়িক বা স্থায়ী ভাবে বন্ধ হয়ে যেতে পারে এবং অনেক ক্ষেত্রে রক্তনালী ফেটে গিয়ে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হতে পারে। এটিই স্ট্রোকের প্রধান কারন।

কোন কোন ক্ষেত্রে স্ট্রোকের ঝুঁকি বেশী?

নিম্নোক্ত ক্ষেত্রে সমূহে স্ট্রোকের সম্ভাবনা অধিক হয়-
# উচ্চ রক্তচাপ
# রক্তে কোলেস্টেরলের উচ্চ মাত্রা
# ডায়াবেটিস এবং
# স্থুলতা বা অধিক স্বাস্থ্যের অধিকারী হওয়া।
# ডাক্তারের পরামর্ষ অনুযায়ী চিকিৎসা নিলে এবং জীবনযাত্রায় কিছু পরিবর্তন আনায়ন করলে এসব # ঝুঁকি অনেকাংশে কমিয়ে আনা যায়।

অভ্যাসগত কিছু পরিবর্তন সাধন করলে স্ট্রোক এর ঝুঁকি কমে আসে, যেমন-
# ধূমপান ত্যাগ করা
# নিয়মিত হালকা ব্যায়াম করা
# অলস জীবনযাপন না করা
# মদ্দপান পরিহার বা কমিয়ে আনা
# অধিক চর্বি ও অধিক কোলেস্টেরল যুক্ত খাবার কম খাওয়া
# খাবার লবন কম গ্রহন করা
# খাবারে শাকসবজির পরিমান বাড়ানো
# খাবারে মাংসের পরিমান কমিয়ে মাছের পরিমান বাড়ানো ইত্যাদি।

নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনের মাধ্যমে যেমনি স্ট্রোকের ঝুঁকি কমিয়ে আনা যায় তেমনি সচেতনতা ও সঠিক পদক্ষেপ গ্রহনের মাধ্যমে স্ট্রোক-পরবর্তী ক্ষয়ক্ষতিও কমিয়ে আনা সম্ভব। তাই আমাদের সকলেরই যেমনি এ সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান ও সচেতনতা থাকা প্রয়োজন তেমনি আমাদের নিকটজনকে এ বিষয়ে সচেতন করাও আমাদের দায়িত্ব।

তথ্যসূত্রঃ
Agency for Healthcare Research and Quality: “Acute Medical and Surgical Management. In: Clinical Guidelines for Stroke Management 2010″
Medscape: “Acute Management of Stroke”
Medscape: “Hemorrhagic Stroke”
Medscape: “Motor Recovery In Stroke”
Medscape: “New Stroke Management Guidelines: A Quick and Easy Guide”
Medscape: “Stroke Prevention”
Medscape: “Transient Ischemic Attack”
National Institute of Neurological Disorders and Stroke: “Post-Stroke Rehabilitation Fact Sheet”
National Stroke Association: “Warning Signs of Stroke”

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here