দৌড়ানোর তুলনায় হাঁটলে মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বাড়ে!

নিয়মিত হাঁটাচলায় হৃদযন্ত্র ভালো থাকে কিংবা শরীরের পেশিগুলো থাকে সচল ও সজীব— এ কথা বহুবার বহু গবেষণায় উঠে এসেছে। এখন বিজ্ঞানীরা বলছেন, মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতার ওপরও রয়েছে এর সরাসরি প্রভাব। তাদের মতে, হাঁটার সময় পায়ের তলায় পড়া চাপের কারণে মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়ে যায়। ফলে মস্তিষ্কের কোষগুলো পুষ্টি পায় সহজে, যা এর কার্যক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। খবর সায়েন্সডেইলি।

নিউ মেক্সিকো হাইল্যান্ড ইউনিভার্সিটির (এনএমএইচইউ) একদল গবেষক সম্প্রতি এ-বিষয়ক একটি গবেষণা করেন। এতে দেখা যায়, হাঁটার সময় পায়ের তলায় যে চাপ পড়ে, তা রক্ত সংবহনতন্ত্রের মধ্য দিয়ে একটি চাপীয় তরঙ্গ প্রেরণ করে। ফলে মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়ে যায়। এতে উদ্দীপ্ত হয়ে ওঠে মস্তিষ্ক কোষগুলো, যা এর কার্যক্ষমতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। এ-বিষয়ক গবেষণা প্রতিবেদনটি গতকাল শিকাগোর পরীক্ষামূলক জীববিজ্ঞান ২০১৭ সম্মেলনে উপস্থাপন করা হয়।

এতদিন পর্যন্ত মস্তিষ্কে রক্ত পরিবহনের (সেরিব্রাল ব্লাড ফ্লো বা সিবিএফ) বিষয়টিকে শরীরের স্বনিয়ন্ত্রিত বিষয় বলে ধারণা করা হতো। অর্থাৎ শরীরচর্চা বা এমন কোনো কারণে রক্তচাপের যে হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটে, তা মস্তিষ্কে রক্ত পরিবহনের ক্ষেত্রে কোনো ভূমিকা রাখে না। কিন্তু এনএমএইচইউর গবেষকরা দেখতে পান, হাঁটার সময় বিপরীত রক্তপ্রবাহের (শরীরের নিম্নাংশ থেকে ঊর্ধ্বমুখী) গতিতে বিশেষ পরিবর্তন ঘটে। হৃদস্পন্দনের সঙ্গে তাল রেখে ঘটা এ পরিবর্তনের ফলে মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহের মাত্রায়ও পরিবর্তন আসে। এ-বিষয়ক একটি পূর্বধারণা থাকলেও এ নিয়ে বিস্তৃত কোনো গবেষণা এর আগে হয়নি।

সাম্প্রতিক গবেষণায় এনএমএইচইউর গবেষকরা ১২ জন তরুণের ওপর পরীক্ষা চালান। তারা শব্দোত্তর তরঙ্গ ব্যবহার করে বিভিন্ন অবস্থায় অংশগ্রহণকারীদের রক্ত সংবহনতন্ত্রের ব্যাস, সংবাহিত রক্তের গতি ও মস্তিষ্কে পরিবাহিত রক্তের পরিমাণের হিসাব নেন। এতে দেখা যায়, দৌড়ানোর তুলনায় হাঁটার সময় কম চাপ পড়লেও এ সময় মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়ে যায়। এ পরিপ্রেক্ষিতে গবেষকরা জানান, মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহের বিষয়টি শরীরের গতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। এ কারণে শরীরচর্চা আমাদের সুস্থ রাখার পাশাপাশি মানসিক তৃপ্তিও দেয়। একই সঙ্গে বর্ধিত এ রক্তপ্রবাহের কারণে মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা থেকে শুরু করে এর দক্ষতাও বেড়ে যায়।

সুতরাং আমাদের শরীর সুস্থ রাখার পাশাপাশি মানসিক তৃপ্তি ও মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা থেকে শুরু করে এর দক্ষতা বাড়াতে নিয়ম করে হাঁটতে হবে।

দৌড়ানোর তুলনায় হাঁটার সময় কম চাপ পড়লেও এ সময় মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়ে যায়।

কখন হাঁটা বা ব্যায়াম করা উচিত? সকালে না বিকেলে? রাতে হাঁটা কি খারাপ? ঘুমের আগে হাঁটলে কি ঘুমের ব্যাঘাত হবে? এ রকম নানা প্রশ্ন মনে। আসলে নিজের জীবনযাত্রার সঙ্গে মিলিয়ে আপনার জন্য যে সময়টা সবচেয়ে উপযোগী সেই সময়টাই বেছে নিন। নিয়মিত হাঁটাই আসল। নিরাপত্তার বিষয়টিও খেয়াল রাখুন। নির্জন সময়ে ব্যায়াম করতে রাস্তায় বেরোলে বিপদের আশঙ্কা থাকে। রাস্তায় খোঁড়াখুঁড়ি চললে বা পথ এবড়োথেবড়ো হলে সেখানে ব্যায়াম করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। সরু গলিপথে যানবাহনের সঙ্গে দুর্ঘটনারও আশঙ্কা থাকে। বাইরে না যেতে পারলে বাড়ির ছাদ হতে পারে তুলনামূলক নিরাপদ।

বাইরে হাঁটার সময়-সুযোগ অনেকেই পান না। তাঁরা বাড়ির বারান্দায় হাঁটতে পারেন। লম্বা বারান্দা বা করিডর থাকলে সেখানেই হাঁটতে পারেন। ঘরের ভেতর বড় জায়গা না থাকলে ঘরের এক কোনা থেকে আরেক কোনা বরাবর বেশ কয়েকবার হাঁটুন। বদ্ধ ঘরে বা জিমে উন্মুক্ত হাওয়া পাওয়া যায় না, তবু না বেরোতে পারলে তাও ভালো।

রোদে হাঁটলে সহজেই হাঁপিয়ে উঠবেন; ত্বকেও রোদের বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। তাই সকাল ১০টার আগে বা বিকেল ৪টার পর বাইরে হাঁটা উত্তম।

ভরপেট খাবার পরপরই হাঁটা ঠিক নয়। ভরপেট খাবার খাওয়ার অন্তত দুই ঘণ্টা পর হাটুন ।সকালে বা বিকেলে হালকা নাশতা করার এক ঘণ্টা পর হাটতে পারেন। আবার ভোরে নাশতার আগেও হাঁটা যায়। হাঁটা শেষে ১০-১৫ মিনিট পর খাবার খেতে পারেন। যাঁদের দিনে সময় নেই, তাঁরা রাতের খাবারটা জলদি খেয়ে ২ ঘণ্টা পর একটু হাঁটতে পারেন। ডায়াবেটিস রোগীরা একেবারে খালি পেটে ভোরে হাঁটতে যাবেন না, হালকা কিছু খেয়ে নেবেন।

হৃদ্রোগীদের জন্য ভারী ব্যায়ামের চেয়ে হাঁটাহাঁটি বা জগিংই ভালো। হাঁটার পর বাড়ি ফিরে ১০-১৫ মিনিট বিশ্রাম নিন এবং পানি পান করুন। তারপর গোসল করুন।

হাঁটার সময়টা যা-ই হোক, প্রতিদিন হাঁটুন। এমনকি সপ্তাহে ৫ দিন আধঘণ্টা করে সময় বের করতে না পারলেও একদিন অন্তর হাঁটা চালিয়ে যান। তবে পরপর দুই দিন বিরতি দেবেন না।

সূত্রঃ বণিক বার্তা / প্রথম আলো

 

.

 

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here