হৈ-চৈ অরিজিনাল বাংলা ওয়েব সিরিজ রিভিউ

হৈ-চৈ অরিজিনাল বাংলা ওয়েব সিরিজ রিভিউ

তাকদীর

পরিচালক: সৈয়দ আহমদ শাওকি

অভিনয়: চঞ্চল চৌধুর (তাকদীর), সানজিদা প্রীতি (সাংবাদিক আফসানা),মনজ কুমার (ক্যামেরাম্যান রানা),সোহেল মন্ডল (মন্টু) প্রমুখ

চঞ্চল চৌধুরী মানেই বাংলাদেশি কন্টেন্টের নবজাগরণ, সেটা সিনেমা হোক কিংবা ওটিটি। চঞ্চল চৌধুরী সবসময় হাত ধরে দেখিয়ে দিয়েছেন যে এরকম গল্প, এরকম চরিত্র নিয়েও বাংলা কন্টেন্ট হয় যেগুলো আমরা দেখে-দেখিয়ে গর্ব করতে পারবো। তাকদীর ঠিক সেরকমই একটা কাজ। যদিও অরিজিনাল কন্টেন্ট হিসেবে প্রোডিউস করেছে ইন্ডিয়ার ওটিটি হইচই, তবুও ওটিটিতে বাংলা কন্টেন্ট যে আসলেই তাক লাগিয়ে দিতে পারে সেটির সূচনা হয়তো তকদীরের হাত ধরেই হলো।

তাকদীরের গল্পটা এক লাশবাহী ফ্রিজার গাড়ির ড্রাইভার তাকদীরকে ঘিরে। হুট করে সে একদিন তার গাড়িতে আবিষ্কার করে একটি অপরিচিত লাশ। কী করবে ভেবে না পেয়ে অস্থির হয়ে যায় তাকদীর, সঙ্গী মন্টুকে নিয়ে বিপদ থেকে উদ্ধার পাবার পথ খোঁজে। এরই মাঝে ফোনে অজানা কারও কাছ থেকে  নির্দেশ পায় লাশ নিয়ে মুন্সিগঞ্জ আসার। টিভিসেটে দেখে লাশের চেহারার সাথে নিখোঁজ হওয়া দুঁদে সাংবাদিক আফসানার চেহারার হুবুহু মিল। তাকদীর টের পায় চোরাবালিতে আটকা পড়েছে সে, যতই বের হতে চায় আরও গভীরে প্রবেশ করছে। তাকদীরের গল্পটা পুরোপুরি নতুন না আবার পুরোপুরি ক্লিশেডও নয়। ন্যারেশনের ক্ষেত্রে ডিরেক্টর পরতে পরতে গল্পের ভাঁজ খুলেছেন, একেবারে সবকিছু দেখাতে চাননি। তবুও মাঝামাঝি এসে মনে হচ্ছিল আরেকটু বিস্তৃত করতে পারতেন বা আরও একটু ইনফরমেশন দিতে পারতেন দর্শকদের। দর্শক হিসেবে আমাদের অবস্থাও তাকদীর আর মন্টুর চেয়ে ভিন্ন কিছু ছিল না, তাদের সাথে সাথে আমরাও ইনফরমেশন পাচ্ছিলাম, কিন্তু পাজল মেলানো যাচ্ছিল না। শেষে এসে এ কারণেই একটু তাড়াহুড়ো লেগেছে, তবে পুরো আভাসই আছে যে সেকেন্ড সিজন পাওয়া যাবে তাকদীরের। তা নাহলে অপূর্ণ থেকে যাবে গল্প। গল্পের এই দুর্বলতাটুকু ঢেকে দিয়েছে অভিনেতাদের অসাধারণ অভিনয়। সব মিলিয়ে তাকদীর দেখিয়ে দিয়ে গেল চোখে আঙুল দিয়ে যে কীভাবে ভালো মানের বাংলা কন্টেন্ট আসলে আমরা লুফে নেই। কীভাবে ভালো গল্প, ভালো অভিনয়ের প্রশংসা করতে আমরা দ্বিধাবোধ করি না। শুধু প্রয়োজন ইনভেস্টমেন্ট, প্রয়োজন দেশীয় ওটিটির নবজাগরণ, প্রয়োজন প্রতিভাবানদের পেছনে অর্থ খরচ করা। আর সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সে কন্টেন্টকে প্রপারলি মার্কেটিং করা ও পৌঁছে দেয়া বিনোদনপ্রিয় মানুষের কাছে। তাহলেই আমরা আরও ভালো ভালো কাজ দেখতে পারবো, ভালো ভালো কাজ নিয়ে প্রশংসা করতে পারবো। দেখিয়ে দিতে পারবো বাংলা কন্টেন্টও কোন অংশে কম না।

চিনি

পরিচালনা: মৈনাক ভৌমিক

অভিনয়: অপরাজিতা (মিষ্টি), মধুমিতা (চিনি), সৌরভ (সুদীপ)

মাল্টিপ্লেক্সের পর্দা জুড়ে ‘ওয়েলকাম ব্যাক’। লকডাউন-পরবর্তী সময় যেন বেশি করে বুঝিয়ে দিল, বড় পর্দায় ছবি দেখার মজাটা আসলে ঠিক কী রকম। সেই আনন্দ আরও দ্বিগুণ হয়, যদি ছবিও মন ভরিয়ে দেওয়ার মতো হয়। অন্য হিন্দি ও ইংরেজি ছবির পাশাপাশি ক্রিসমাসে পরিচালক মৈনাক ভৌমিকের ‘চিনি’ও হাজির প্রেক্ষাগৃহে, বড়দিনের কেকের মতোই। একটু কম মিষ্টির এই যা!মা-মেয়ের গল্প বলেছেন মৈনাক। মিষ্টি (অপরাজিতা আঢ্য) আর তার মেয়ে চিনির (মধুমিতা সরকার) সম্পর্কটা আর পাঁচটা বাঙালি মা-মেয়ের চেয়ে একটু আলাদা। আর সেই সম্পর্কের শিকড় যাকে ঘিরে, সেই মানুষটি গত হলেও তার অদৃশ্য উপস্থিতি এখনও ছায়ার মতো লেপটে সারা বাড়িতে। সে বাড়িতে থাকতে পারে না চিনি, যে বাড়ি তার বাবার অত্যাচারে নরকে পর্যবসিত। সুদীপের (সৌরভ দাস) সঙ্গে লিভ-ইন করে চিনি। অফিসে বিজ্ঞাপনের ট্যাগলাইন লেখে, বসের বাঁকা কথা শোনে, থেরাপিস্টের কাছে কাউন্সেলিং করাতে যায়। আসলে চিনির জীবনে শান্তি নেই দু’দণ্ড। তার মা-ও ভাল থাকার পথ খুঁজে নিতে চাইছে নিজের মতো করে।

মিলেনিয়ালদের চেনা দুঃখ, চেনা সুখই তুলে ধরা হয়েছে ছবিতে। দুই প্রজন্মের পরিচিত বিরোধগুলিকেও হাত ধরাধরি করে হাঁটিয়েছেন পরিচালক। রান্নাঘরে আমিষ খেলে যে মা চোটপাট করত মেয়ের উপরে, আলাদা থাকবে বলে যখন ২৪-২৫ বছরের সেই মেয়েই বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে যায়, মা নাড়ুর কৌটো ধরিয়ে দেয় তার হাতে। মেয়ের লিভ-ইন পার্টনারের সঙ্গে দারুণ ভাল সম্পর্ক, এ দিকে পরমুহূর্তেই প্রচণ্ড রেগে গিয়ে সেই ছেলেকেই ‘রাস্তার ছেলে’ বলে বসে চিনির মা। এই স্ববিরোধিতা ছবিতে এসেছে মাঝে মাঝেই। মায়ের সঙ্গে, প্রেমিকের সঙ্গে সম্পর্কের ব্যাপারে চিনির দ্বিধা-দ্বন্দ্বের কারণ হিসেবে দর্শানো হয় তার অস্থির ছেলেবেলা। তার রেফারেন্স চিনি বা তার মায়ের কথাতেই উঠে আসে, যা চিনির প্রেমিকের মতোই দর্শকের কাছেও পৌঁছয় বেশ দেরিতে। অত্যাচারী বাবার গায়ে সন্তানের হাত তোলা, শেষে মারণব্যাধি ধরা পড়ার মতো খুবই প্রত্যাশিত কিছু বাঁক রয়েছে গল্পে, যা তেমন ধাক্কা দেয় না। প্রধান চরিত্রদের দুঃখ, রাগ বা যন্ত্রণাই ছবির অনেকটা জুড়ে। তবে তার সঙ্গে কতটা একাত্ম হতে পারবেন দর্শক, সে প্রশ্ন রয়ে যায়।

অপরাজিতা আঢ্যকে তাঁর চেনা রূপে পাওয়া গিয়েছে ছবিতে, যা ক্ষেত্রবিশেষে উচ্চকিত। মধুমিতা সরকার আবেগের দৃশ্যগুলিতে ভাল, অন্য জায়গায় সামান্য ওভারস্মার্টনেস ছাপিয়ে গিয়েছে তাঁর সহজাত অভিনয়ক্ষমতাকে। তুলনায় সুযোগ কম পেলেও সাবলীল অভিনয়ে নজর কাড়েন সৌরভ দাস। ভাল লাগে ছবির গান, বিশেষ করে লগ্নজিতা চক্রবর্তীর কণ্ঠে ‘তোমার চোখের শীতলপাটি’। ক্যামেরা চার দেওয়ালের বাইরে তেমন বেরোয়নি, যা একটু ক্লান্তিকর। তবে ক্রিসমাসের আবহে বৃষ্টিভেজার দৃশ্য দেখতেও বেশ লাগে। মৈনাকের ছবির চেনা আস্বাদ এ ছবিতেও বহাল। শুধু চিনিটা মাপমতো হলেই জমে যেত!

ওয়েব সিরিজ: ব্যোমকেশ

আভিনয়: অনির্বাণ ভট্টাচার্য, (ব্যোমকেশ) ঋদ্ধিমা ঘোষ, সুব্রত দত্ত প্রমুখ

বিগত কয়েক বছর যাবৎ ব্যোমকেশ নিয়ে এত কাজ হয়েছে বাংলায় যে দর্শকের কাছে মোটামুটি ব্যোমকেশের গল্পগুলি আপাতত জলভাত হয়ে গিয়েছে। যাঁরা ব্যোমকেশের মগ্ন পাঠক, তাঁদের কাছে কীভাবে নতুন কোনও আঙ্গিকে নিয়ে আসা যায় ব্যোমকেশকে, তা চিত্রনাট্যকার-পরিচালকদের কাছে একটি চ্যালেঞ্জ। হইচই-এর ব্যোমকেশ সিরিজের পঞ্চম সিজনটি নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। সিনেম্যাটোগ্রাফার সৌমিক হালদার এখানে পরিচালকের ভূমিকায়। সিরিজটি দেখতে বসে একটু মনোযোগী দর্শক মাত্রেই বুঝবেন যে পরিচালককে একটি সীমিত বাজেটের মধ্যে কাজটি সারতে হয়েছে তাই কিছু সিকোয়েন্স বা দৃশ্য যে উচ্চতায় পৌঁছতে পারত তা স্পর্শ করতে পারেনি। কিন্তু পরিচালক বা চিত্রনাট্যকারের ভাবনা সেই প্লেন ছুঁয়ে ফেলতে সমর্থ হয়েছে। যে দর্শক নিয়মিত ওয়েব সিরিজ দেখেন আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মগুলিতে, তাঁরা দেখলেই বুঝবেন।

তবে এই সিজনের ইউএসপি– ব্যোমকেশের দুটি জানা গল্পের একটি নব্য পুনর্নির্মাণ। সম্পূর্ণ আলাদা দুটি গল্পকে অত্যন্ত মুন্সিয়ানার সঙ্গে চিত্রনাট্যকার বেঁধে ফেলেছেন একটি প্লটে এবং প্রেক্ষাপটে রেখেছেন পঞ্চাশের মন্বন্তর। ‘খুঁজি খুঁজি নারি’ এবং ‘দুষ্টচক্র’– গল্প দুটিকে যেভাবে একটি প্লটে মিশিয়েছেন চিত্রনাট্যকার তা অনবদ্য। অথচ সেখানে মূল গল্পদুটির বহু কথোপথন হুবহু রাখা হয়েছে সংলাপে যা ভাল লাগবে যে কোনও ব্যোমকেশভক্তের। কিন্তু চিত্রনাট্যের প্রকৃত উত্তরণ ঘটেছে মন্বন্তরের আলোয় সত্যান্বেষী ব্যোমকেশকে দেখায়। সত্যের সন্ধানে যে প্রতিনিয়ত ফেরে, যার কাছে যা কিছু সত্য তাই একমাত্র সুন্দর, তাকে অশান্ত করে তোলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-কালোবাজারি। যাঁরা ওই সময়ের ইতিহাস নিয়ে অল্পবিস্তর চর্চা করেছেন, তাঁরা জানেন, ওই মন্বন্তরটি ঘটেছিল মূলত মজুতদারদের চক্রান্তে। সেই দুর্নীতি আর মিথ্যার মায়াজাল ব্যোমকেশকে যন্ত্রণা দেয়। অন্য ব্যোমকেশ, সত্যবতী ও অজিত ফুটে ওঠে ইতিহাসের ক্যানভাসে। অনির্বাণ ভট্টাচার্য বহু দর্শকেরই প্রিয় ব্যোমকেশ। এই সিজনে তাঁকে আরও বেশি ভাল লাগে।সিরিজের কাস্টিং চমৎকার। সুপ্রভাত দাস, ঋদ্ধিমা ঘোষ, রাজর্ষি দে, ইন্দ্রাশিস রায় অত্যন্ত পরিমিত। অন্যান্য চরিত্রগুলিতেও অভিনয় চমৎকার। অনিমেষ ঘড়ুইয়ের সিনেম্যাটোগ্রাফি এবং সংলাপ ভৌমিকের এডিটিংও ভাল। বেশিরভাগ গোয়েন্দা গল্পকেই সাদামাটা থ্রিলারের মতো যে ট্রিটমেন্ট দেওয়া হয়, এই সিজনটি তার থেকে কিঞ্চিৎ আলাদা।

কয়েকটি দৃশ্য এবং সিকোয়েন্সের উপস্থাপনা আরও পেশাদার হতে পারত, বিশেষ করে স্বপ্নদৃশ্যটি। তবে সামগ্রিকভাবে পিরিয়ডের নির্মাণ ভাল।

You have successfully subscribed to the newsletter

There was an error while trying to send your request. Please try again.

Living Art Style will use the information you provide on this form to be in touch with you and to provide updates and marketing.